Thu 05 November 2026
Cluster Coding Blog

T3 - বিজয়া সংখ্যায় দীপঙ্কর বৈদ্য

maro news
T3 - বিজয়া সংখ্যায় দীপঙ্কর বৈদ্য

অষ্টমীর সেই ভিড়

চম্পাহাটি বান্ধব সমিতির শারদোৎসব মানেই প্রতি বছর নতুন কিছু। কখনও মণ্ডপের থিম চমকে দেয়, কখনও আলোর কারুকাজ, কখনও আবার প্রতিমার সাজ। পুজোর কয়েকটা দিন এই ছোট্ট এলাকাটাই যেন অন্য এক শহর হয়ে ওঠে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। অষ্টমীর সন্ধ্যায় ভিড় এতটাই বাড়ে যে, মণ্ডপে ঢোকার লাইন পেরোতে কখনও কখনও এক ঘণ্টাও লেগে যায়। সেবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অষ্টমীর সন্ধ্যা। রাস্তার দুপাশে ঝলমলে আলো। ঢাকের শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মানুষের গুঞ্জন। কেউ পরিবার নিয়ে এসেছে, কেউ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে। প্যান্ডেলের বাইরে ফুচকার দোকান, চাউমিনের স্টল, আইসক্রিমের ঠেলা – সব মিলিয়ে উৎসবের এক অন্যরকম উন্মাদনা।


     অর্ক দাঁড়িয়ে ছিল লাইনে একাই। বন্ধুরা আসবে বলেও শেষ মুহূর্তে কেউ আসেনি। তাই অর্ক ঠিক করেছিল, একাই পুজো দেখে বাড়ি ফিরবে। মোবাইলটা পকেটে রেখে সে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল।


সামনে অন্তত শ'দেড়েক মানুষ। অর্ক একবার ঘড়ি দেখল। রাত সাড়ে আটটা। – "আজ মণ্ডপে ঢুকতেই দশটা বাজবে," মনে মনে ভাবল সে।


     ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো – "দাদা, লাইনটা কি এদিক থেকেই?"


     অর্ক ঘুরে তাকাল। মেয়েটা একটু হাঁপাচ্ছে। সম্ভবত ভিড় ঠেলে এসেছে। পরনে সাদার ওপর লাল পাড়ের শাড়ি। চুল খোলা। কপালে ছোট্ট লাল টিপ। খুব বেশি সাজগোজ নেই। অথচ অর্কের চোখ আটকে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তরই দিতে পারল না।


     মেয়েটা আবার বলল, "শুনছেন?"


     অর্ক যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরল। – "হ্যাঁ... হ্যাঁ, এদিক থেকেই। তবে লাইনটা অনেক লম্বা।"


     মেয়েটা চারপাশে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, "সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।"


     অর্কও হেসে ফেলল। এইটুকুই ছিল তাদের প্রথম কথা। কিন্তু সেই সামান্য কথাটুকুই অর্কের মনে অদ্ভুত একটা ঢেউ তুলল। মেয়েটা তার একটু সামনে দাঁড়াল। ভিড়ের চাপে মাঝেমধ্যে পিছিয়ে আসছে, আবার লাইন এগোলে সামনে যাচ্ছে। অর্ক চেষ্টা করছিল স্বাভাবিক থাকতে। পারছিল না। কিছুক্ষণ পর মেয়েটা মোবাইল বের করল। স্ক্রিনে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বলল, "নেটওয়ার্কই নেই!"


     অর্ক বলল, "এত ভিড়ে নেটওয়ার্ক থাকবে কী করে? সবাই ছবি তুলছে, ভিডিও করছে।"


     – "তা ঠিক। কিন্তু আমার মা-কে ফোন করতে হবে। উনি সামনে কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন।"


     – "চাইলে আমার ফোন থেকে করতে পারেন।" কথাটা বলে অর্ক নিজেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।


     মেয়েটা তাকিয়ে বলল, "আপনার ফোনে নেট আছে?"


     – "ফোন করতে তো নেট লাগে না।"


     মেয়েটা হেসে ফেলল। – "ওহ! ঠিক বলেছেন।"


     তারপর অর্কের ফোন থেকে সে মাকে ফোন করল। কয়েকবার চেষ্টা করার পর যোগাযোগ হলো।


     – "মা, তুমি কোথায়?"


     অর্ক তখন মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অকারণে মেয়েটির কথোপকথন শুনতে তার ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, খুব ব্যক্তিগত কোনো জায়গায় ঢুকে পড়ছে।


     ফোন রেখে মেয়েটি বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ।"


     – "আরে, এতে থ্যাঙ্ক ইউ-এর কী আছে?"


     – "আছে। আজকাল তো অপরিচিত কাউকে কেউ ফোনও দেয় না।"


     অর্ক একটু হেসে বলল, "সবাই খারাপ নয়।"


     মেয়েটি এবার তার দিকে তাকাল। সেই প্রথম অর্ক খেয়াল করল, মেয়েটির চোখ দুটো খুব শান্ত।


     – "আপনার নামটা জানতে পারি?"


     প্রশ্নটা শুনে অর্কের বুকের ভিতর যেন হঠাৎ ঢাক বাজল।


     – "অর্ক।"


     – "আমি সীমা।"


     সীমা নামটা শুনে অর্ক মনে মনে কয়েকবার উচ্চারণ করল। – "সীমা...। অদ্ভুত সুন্দর একটা নাম।"


     লাইন ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। তাদের কথাও বাড়ছিল। কোথায় থাকে, কোথায় কাজ করে, পুজোয় কোথায় কোথায় ঘুরেছে – খুব সাধারণ কথাবার্তা। কিন্তু অর্কের কাছে প্রতিটি কথাই যেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। হঠাৎ সামনে প্রচণ্ড ধাক্কাধাক্কি শুরু হলো। সীমা সামলে উঠতে না পেরে এক পা পিছিয়ে এলো। অর্ক স্বাভাবিকভাবেই হাত বাড়িয়ে তাকে সামলে দিল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের স্পর্শ।


     সীমা হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, "সরি।"


     – "সরি কেন?"


     – "আপনাকে ধাক্কা দিলাম।"


     – "আপনি দেননি। ভিড় দিয়েছে।"


     সীমা হেসে বলল, "তাহলে আজকের রাতের দোষ ভিড়ের।"


     অর্কও হাসল। কিন্তু সে জানত, এই ভিড়ের ওপর তার কোনো রাগ নেই। বরং মনে হচ্ছিল, এই ভিড় না হলে

সীমার সঙ্গে তার দেখা হতো না। মণ্ডপের প্রবেশদ্বার এসে গেল। সীমার সঙ্গে আরও দুজন মহিলা যোগ দিলেন। সম্ভবত তার মা আর আত্মীয়।


সীমা যাওয়ার আগে একবার অর্কের দিকে তাকাল।


     – "আপনি কি এখানে একাই এসেছেন?"


     – "হ্যাঁ।"


     – "বন্ধুরা?"


     – "আসার কথা ছিল। আসেনি।"


     – "তাহলে আজ একাই পুজো দেখবেন?"


     অর্ক একটু হেসে বলল, "দেখি।"


     সীমা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, "তাহলে... পুজো দেখে বেরিয়ে ওই সামনের চায়ের দোকানের কাছে থাকবেন?"


     অর্কের বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল। – "কেন?"


     সীমা এবার একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল, "এত কথা হলো... গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে গেলে কেমন যেন লাগে।"


     তারপর সে মায়ের সঙ্গে মণ্ডপের ভিতরে ঢুকে গেল। অর্ক দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, এই অষ্টমীর রাতটা হয়তো সত্যিই অন্যরকম।


     সেদিন চম্পাহাটি বান্ধব সমিতির মণ্ডপে হাজার হাজার মানুষ এসেছিল। সবাই নতুন থিম দেখতে এসেছিল। অর্ক এসেছিল পুজো দেখতে। কিন্তু সেদিন সে পুজোর চেয়েও বড় কিছু পেয়েছিল। একটি নাম। একটি হাসি। এক জোড়া চোখ। আর একটি অসমাপ্ত গল্পের শুরু। চায়ের দোকানের সামনে পরে সত্যিই দাঁড়িয়েছিল দুজন। তারপর আরও অনেক কথা। আর সেই রাতেই, বাড়ি ফেরার পথে অর্ক বুঝেছিল – জীবনে কিছু কিছু মানুষকে আমরা খুঁজতে বেরোই না। তারা হঠাৎ এসে

আমাদের খুঁজে নেয়। সীমাও ঠিক তেমনই এসেছিল। অষ্টমীর ভিড়ের মধ্যে। একটি দীর্ঘ লাইনের পাশে। আর অর্কের জীবনে

সেই রাত থেকেই

শুরু হয়েছিল তার প্রথম প্রেম।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register