- 57
- 0
বাড়ির দুর্গাপুজো:
পুজোয় ঘটপাতার জন্য গঙ্গাজল হরিদ্বারের, হৃষিকেশের, গোয়ালপাড়ার সূর্যপাহাড়ের আকাশীগঙ্গার জলটা গুয়াহাটির বাসায়। তা হোক, এই জলেই পুজো হবে। সাথে ভক্তি। মনে মনে এই কটি কথা বলে শুরু করলাম এবারের দুর্গাপুজো।
একটা স্বস্তিকা আঁকা মায়ের ঘটের সুবাসিত জলে কিছু আতপ চাল, গোটা সুপুরি বা হরতকী, হলুদের গাঁট, লক্ষ্মীকড়ি, ফুলসহ লবঙ্গ, এলাচ দিতে হবে। অশ্বগন্ধা অগুরু চন্দন কর্পূর দিয়ে ঘটের জল সুবাসিত করা হয়। ঘট স্থাপনের জায়গাটিতেও অশ্বগন্ধা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মায়ের অভিষেকের জন্য তাম্রপাত্রে গঙ্গাজল নিয়ে অশ্বগন্ধা অগুরু, রক্তচন্দন, কর্পূর, জাফরান, গোলাপজল ও কিছু ফুলের পাপড়ি দেওয়া হল। আচমনের (দেবী দুর্গার নৈবেদ্য ও মিষ্টি নিবেদনের পর যে আচমন) জন্য আলাদা কোনো জল না হলেও চলে। কোশাকুশিতে জলশুদ্ধি করে রাখা জলই ব্যবহার করা যাবে।একটি কোশা হলেই চলবে, কিন্তু তিনটি কুশি নিতে হবে, তিনজন ব্রতীর সংকল্পের জন্য। তামা ও পেতলের ছোট বড় দু'তিনটি পুষ্পপত্র থাকলেও, পূজাস্থান অপরিসর বলে পেতলের সাজিটিই পুষ্পপত্র হিসেবে ব্যবহার করা হল। শ্বেত চন্দন, রক্ত চন্দন— দুটোই বেটে রাখা হল। চন্দন সবেতেই লাগে। ঘটের জলে, অভিষেকের জলে, কোশাকুশির জলে, নৈবেদ্যে, মিষ্টিদ্রব্যে, নিবেদিত পানীয় জলে, ফলে, ফুলে, পুষ্পপত্রে— সর্বত্র। পুষ্পপত্রে আতপচাল, পঞ্চশস্য, অগুরু, কর্পূর, অশ্বগন্ধা, ও কোশাকুশির জল ছিটিয়ে দিতে হবে। কোশাকুশির জল ও তুলসী লাগে ধূপ-দীপ পবিত্রকরণে, নৈবেদ্য-মিষ্টি-ফল-পানীয় জল নিবেদনে।
মা-তো আমার বাড়িতে নিত্য ফুল-জল-মিষ্টি-ধূপ-দীপে পূজিতা। তাই যতটা সংক্ষেপে পুজোটা করা যায়— সেভাবেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বাড়ির নিত্য পুজোর প্রদীপ তিল তেলে জ্বালিয়ে রাখা। সেটাই আজ মা দুর্গার নামে নিবেদিত হবে। এছাড়া থাকবে চারদিনে চারটি নতুন মাটির প্রদীপ যা ঘি-এ জ্বলবে। কর্পূরদীপদানিতে কর্পূর জ্বলবে আরতির সময়। গাছের ফুল, জানি না কোনটা লাগে বা লাগে না, আমি যা ছিল সব তুলে রেখেছি। সেখানে জবা, নীল অপরাজিতা, শেফালি, নয়নতারা, রঙ্গন, মধুমালতির সাথে অ্যাডেনিয়াম ফুলও ছিল। পুত্র আমার উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্র। তাকে এসব জানালে বলল: "পূজা এলে সবচেয়ে কষ্ট গাছেদের।" সত্যিই তো, তুলসীপাতা, দূর্বারও রেহাই নেই। দূর্বার বড় অভাবও। আর আছে পিতলের আম্রপল্লব, পিতলের ডাব, রূপোর বেলপাতা। গামছা কিন্তু অনেকগুলো লাগে। যেমন: ঘটের ওপর গামছা, তার উপরে যথাক্রমে নিখুঁত পানপাতা (বৃন্ত মায়ের বেদীর দিকে, সূচালো প্রান্তভাগ ব্রতীর দিকে), সশীষ সিঁদূরচর্চিত ডাব, তার ওপর আর একটি গামছা (ঘটাচ্ছাদন) দিতে হবে। ডাবের শীষে পৈতে জড়িয়ে দিতে হবে। ঘটে একটি চাঁদমালা দিতে হবে। ঘটটি মালাবেষ্টিত হবে। পঞ্চগুঁড়ি, পঞ্চশস্য ও দূর্বা দিয়ে ঘট পাততে হয়।
পঞ্চশস্য বলতে বোঝায়: ধান, যব, তিল, মুগ ও মাষকলাই।
পঞ্চগুঁড়ি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। জানার ইচ্ছে থেকে জেনে নিয়েছি। পঞ্চগুঁড়ি হিন্দু ধর্মের পূজার্চনায় ব্যবহৃত পাঁচ রকম গুঁড়ো, যা দিয়ে পূজার বেদি, ঘটের আসন ও আলপনা তৈরি করা হয়। তো পঞ্চগুঁড়ির পাঁচটি রং ও তার উপাদান হল: ১. হলুদ — পীতবর্ণ, উপাদান: সরাসরি হলুদগুঁড়ো বা হরিদ্রাচূর্ণ যা মঙ্গল, সমৃদ্ধি ও শুভ সূচনার প্রতীক। ২. সাদা — শ্বেতবর্ণ, উপাদান: আতপ চালের গুঁড়ো বা তণ্ডুলচূর্ণ যা পবিত্রতা ও শুদ্ধতার প্রতীক। ৩. লাল — রক্তবর্ণ, উপাদান: কুসুম বা জবাফুলের গুঁড়ো যা শক্তি, প্রাণশক্তি ও দেবীর আরাধনার প্রতীক। ৪. কালো — কৃষ্ণবর্ণ, উপাদান: শস্যহীন ধান পুড়িয়ে তৈরি গুঁড়ো যা প্রথাগত পঞ্চগুঁড়ির অন্যতম বর্ণ। ৫. সবুজ — শ্যামলবর্ণ, উপাদান: বেলপাতার গুঁড়ো বা বিল্বপত্রচূর্ণ যা প্রকৃতি, সতেজতা ও জীবনের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। আলপনায় কোন রং প্রথমে, তারপর কোনটি দেবো— এক ঝলক ভাবলাম, পঞ্চগুঁড়ির পাঁচটি রং ব্যবহারের সর্বজনস্বীকৃত, বাধ্যতামূলক ক্রম কি হতে পারে ভেবে পরে নিজের মত করেই আলপনার ছোঁওয়া দিলাম।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার— আলপনার নকশা, পূজার রীতি ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী ক্রম বদলাতে পারে। পুজোর প্রশস্ত পরিসরে সাদা রঙটি — প্রথমে মূল নকশার রেখা ও কাঠামো তৈরিতে, হলুদ — পরের ধাপে মঙ্গলসূচক অংশ বোঝাতে, লাল — ফুল, পদ্ম বা বিশেষ নকশায়, সবুজ — পাতা, লতাপাতা ও প্রকৃতির নকশায়, সব শেষে কালো রঙটি প্রয়োজনমতো সীমারেখা বা বৈপরীত্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা যেতেই পারে।
ঘট একদিন পেতে চারদিনই সেই ঘট পূজিত হবে। অভিষেক চারদিনই হবে।
আসনে সপরিবারে (কলা-বৌসহ) সবাহনারূঢ়া দেবী দুর্গার ছোট্ট একটি প্রতিকৃতি অসুর ও মহিষাসুর— সবাই পূজিত হন।
পূজার নিয়মানুযায়ী পরপর গুরুসহ দেবদেবীদের স্মরণপর্বটি সমাধা করা হয় এইরূপে— বিঘ্ননাশায় সর্বসিদ্ধিদাতা গনেশ, শিবাদিপঞ্চদেবতা ( পঞ্চদেবতা হলেন— শিব — সংহার ও রূপান্তরের দেবতা। বিষ্ণু — পালনকর্তা। দেবী বা শক্তি — জগন্মাতা, আদ্যাশক্তি। সূর্য — জ্যোতির্ময় দেবতা। গণেশ — সিদ্ধিদাতা ও বিঘ্ননাশক।), আদিত্যাদিনবগ্রহ, ইন্দ্রাদিদশদিকপাল (পূর্বে— ইন্দ্র, অগ্নিকোণে— অগ্নি, দক্ষিণ– যম, নৈঋতে— নিরৃতি, পশ্চিমে— বরুণ, বায়ুকোণে– পবন, উত্তরে— কুবের, ঈশান কোণে— ঈশান বা শিব, ঊর্ধ্বে— ব্রহ্মা, অধঃ-এ অনন্ত বা শেষনাগ), নারায়ণ, গুরু, জপমন্ত্রপাঠ, গুরুপ্রণাম, শিব-পার্বতি, হর-গৌরী, লক্ষ্মী-নারায়ণ, রাধা-কৃষ্ণ, সরস্বতীসহ অন্যান্য ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করার মাধ্যমে। এরপর নবগ্রহস্তত্র, হনুমানচালিশা (যদি পাঠ করা হয় নিত্য)।
এরপর--- দুর্গাপুজোর পদ্ধতি পরপর একঝলকে: ঘট স্থাপন, আচমন, বিষ্ণুস্মরণ, জলশুদ্ধি, আসনশুদ্ধি, করশুদ্ধি ও অঙ্গন্যাস (আমি করিনি), ভূতশুদ্ধি (এটাও করিনি), দ্বারপাল ও দিকপাল পুজো (আগেই স্মরণ করে প্রণাম জানিয়েছি), গনেশের বন্দনা, শিবের ধ্যান (আগেই স্মরণ করা), দেবীর আবাহন, যেহেতু দেবী নিত্য পূজিতা, তাই এখানে প্রাণপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি থাকছে না। এরপর--- সংকল্প, দেবীর ধ্যান, মধুপর্ক ও আচমনীয় (দেবীর মুখ ধোবার জল) তৈরি, বস্ত্র নিবেদন, অলঙ্কার নিবেদন ও চন্দনলেপন, পুষ্পমাল্য অর্পণ, ধূপ ও দীপ পবিত্রকরণ, নৈবেদ্য ও ভোগ নিবেদন, আচমনের জল অর্পণ, তাম্বুল (কুচোনো সুপুরি, এলাচ ও লবঙ্গ দিয়ে পানের খিলি) নিবেদন, পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ, প্রণাম ও প্রার্থনা, দক্ষিণা নিবেদন, আরতি (ধূপ, ঘিএর দীপ, পঞ্চপ্রদীপ, কর্পূরদীপ, মালা, বস্ত্র-উত্তরীয়, জলশঙ্খ, গামছা, চামর, পাখা, ফুল--- দিয়ে, ঘন্টাবাদ্যে শঙ্খে, উলুধ্বনিতে), ক্ষমা-প্রার্থনা করে প্রত্যহ পুজো সমাপন। শুধু দশমীতে ক্ষমাপ্রার্থনাতে পুজো শেষ নয়, ঘট বিসর্জন ও শান্তিজল গ্রহণে পুজো শেষ।
এবারে পুজোর উপরোক্ত সূচি অনুযায়ী পরপর মন্ত্রগুলি যথাসম্ভব লিখলাম।
ঘট-স্থাপনসংক্রান্ত মন্ত্র: ১. ঘটশুদ্ধি বা ঘট মার্জনা মন্ত্র: গঙ্গাজল ছিটিয়ে বলতে হবে:
ওঁ ঘটস্য উপরি গন্ধপুষ্পে ওঁ হ্রীং দুর্গৈ নমঃ।
ওঁ সর্বতীর্থসমুদ্ভূতং সর্বদেবসমন্বিতম্।
ইমং ঘটং সমারুহ্য তিষ্ঠ দেবি গণৈঃ সহ।।
অর্থ: হে দেবি! সমস্ত পবিত্র তীর্থের জল এবং সকল দেব-দেবীর শক্তি সমন্বিত এই ঘটে আপনি আপনার গণ বা সঙ্গীদের নিয়ে অধিষ্ঠান করুন।
২. ঘটে জল ভরার মন্ত্র:
ওঁ আ কলশেষু ধাবতি পবিত্রে পরিষিচ্যতে।
উথো দেবেষু নো দধৎ।।
ওঁ বরুণস্যোত্তম্ভনমসি বরুণস্য স্কম্ভসর্জনীস্থো।
বরুণস্য ঋতসদন্যসি বরুণস্য ঋতসদনমসি বরুণস্য ঋতসদনাসীদ।।
৩. পঞ্চশস্য বা ধান দেওয়ার মন্ত্র (ধানের ওপর ঘট বসানোর নিয়ম): মাটির বেদীর ওপর পঞ্চগুঁড়ির আল্পনা দিয়ে কিছুটা ধান বা পঞ্চশস্য বিছিয়ে তার ওপর ঘটটি বসাতে হয়।
ওঁ ধান্যমসি ধিনুহি দেবান ধিনুহি যজ্ঞং ধিনুহি যজ্ঞপতিং।
ধিনুহি মাং যজ্ঞন্যম্।।
৪. আমপল্লব বা পঞ্চপল্লব অর্পণ মন্ত্র:
ওঁ অয়মুর্জাবতো বৃক্ষ উর্জিভ ভব পুত্রিণী।
পর্ণং বনস্পতে নু ত্বা নু ত্বা সূয়তাং রয়িঃ।।
৫. ঘটে ডাব বা ফল স্থাপন মন্ত্র: ডাবের গায়ে সিঁদুরের স্বস্তিক চিহ্ন এঁকে—
ওঁ শ্রীশ্চ তে লক্ষ্মীশ্চ পত্ন্যাবহোরাত্রে পার্শ্বে নক্ষত্রাণি রূপমশ্বিনৌ ব্যাত্তম্।
ইষ্ণন্নিশাণামুম্ম ইষাণ সর্বলোকম্ম ইষাণ।।
এষ সচন্দন-সোপকরণ-নারিকেলং (বা ফলং) ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
৬. ঘটে দেবীর আবাহন ও স্থিরীকরণ মন্ত্র: ঘটটি পুরোপুরি সুন্দর করে সাজানোর পর (লাল কাপড় বা গামছা জড়িয়ে, ফুলের মালা পরিয়ে) হাত জোড় করে ঘটে দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও ঘটকে স্থির করার জন্য—
ওঁ স্থাং স্থীং স্থিরো ভব। যাবৎ পূজাং করোহ্যহম্।
তাবৎ ত্বং সুস্থিরো ভূত্বা ঘটে সন্নিহিতো ভব।।
অর্থ: হে মা মহামায়া, আমি যতক্ষণ আপনার এই পূজা সম্পন্ন করছি, ততক্ষণ আপনি এই ঘটে সুস্থির হয়ে পরম শান্তিতে অবস্থান করুন।
জলশুদ্ধি মন্ত্র
ওঁ গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি। নর্মদে সিন্ধু কাবেরি জলেঽস্মিন্ সন্নিধিং কুরু॥
আচমন মন্ত্র
ওঁ বিষ্ণুঃ, ওঁ বিষ্ণুঃ, ওঁ বিষ্ণুঃ
বিষ্ণু স্মরণ মন্ত্র:
ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সুরয়ঃ। দিবীব চক্ষুরাততম্।
নমো অপবিত্রঃ পবিত্রোবা সর্ব্বাবস্থাং গতোহপি বা। যঃ স্মরেৎ পুন্ডরীকাক্ষং সঃবাহ্য অভ্যন্তরঃ শুচিঃ
আসন শুদ্ধি মন্ত্রসমূহ
১। মণ্ডল পূজার মন্ত্র:
ওঁ হ্রীং আধারশক্তয়ে কমলাসনায় নমঃ
২। বিনিযোগ মন্ত্র:
ওঁ আসনমন্ত্রস্য মেরুপৃষ্ঠঋষিঃ সুতলং ছন্দঃ কুর্ম্মো দেবতা আসনোপবেশনে বিনিয়োগঃ।
৩। মূল আসন শুদ্ধি মন্ত্র:
ওঁ পৃথ্বি ত্বয়া ধৃতা লোকাদেবি ত্বং বিষ্ণুনা ধৃতা।
ত্বঞ্চ ধারয় মাং নিত্যং পবিত্রং কুরু চাসনম্ ॥
পুষ্প শুদ্ধি মন্ত্র
ওঁ পুষ্পে পুষ্পে মহাপুষ্পে সুপুষ্পে পুষ্পসম্ভবে।
পুষ্পচয়াবকীর্ণে চ হুং ফট স্বাহা।
এরপর—
গনেশবন্দনা: গণেশ পূজা মন্ত্র:
একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদর গজাননম।
বিঘ্নবিনাশকং দেবং হেরম্বং পনমাম্যহম।।
অর্থাৎ, যিনি একদন্ত, মহাকায়, লম্বোদর, গজানন এবং বিঘ্ননাশকারী সেই হেরম্বদেবকে আমি প্রণাম করি।
ধ্যান মন্ত্র:
ওঁ খর্বং স্থূলতনুং গজেন্দ্রবদনং লম্বোদরং সুন্দরং প্রস্যন্দম্মদগন্ধলুব্ধ মধুপব্যালোলগণ্ডস্থলম্।
দন্তাঘাত বিদারিতারিরুধিরৈঃ সিন্দুরশোভাকরং,
বন্দেশৈল সুতাসুতং গণপতিং সিদ্ধিপ্রদং কামদম্।।
গণেশ বন্দনা:
বন্দ দেব গজানন বিঘ্ন বিনাশন।/নমঃ প্রভু মহাকায় মহেশ নন্দন।।/সর্ববিঘ্ন নাশ হয় তোমার শরণে।/অগ্রেতে তোমার পূজা করিনু যতনে।।/নমো নমো লম্বোদর নমঃ গণপতি।/মাতা যার আদ্যাশক্তি দেবী ভগবতী।।/সর্বদেব গণনায় অগ্রে যার স্থান।/বিধি-বিষ্ণু মহেশ্বর আর দেবগণ।।/ত্রিনয়নী তারার বন্দিনু শ্রীচরণ।/বেদমাতা সরস্বতীর লইনু শরণ।।
মন্ত্রঃ – ওঁ গাং গণেশায় নমঃ।
ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং গনপতিং বিদ্যুদ্বর্ণং গজাননং।/শ্বেতাম্বরং সিতাব্জস্থং স্বর্ণমুকুট শোভিতম্।।/শ্বেতমূষিক পৃষ্ঠন্যস্তবামচরনং সিদ্ধিদং।/বামজান্বারোপিতদক্ষিনপদং চতুর্ভুজম্।।
অর্থাৎ যিনি বিদ্যুৎবর্ণ, গজানন, শ্বেতবস্ত্র পরিহিত, শ্বেতপদ্মে অবস্থিত, মাথায় স্বর্ণমুকুট শোভাস্থিত, যাঁর বামচরণ শ্বেতমূষিকের পৃষ্ঠে রাখা এবং বাম পা হাঁটুর ওপর অবস্থিত। যিনি সিদ্ধিদাতা ও চতুর্ভুজ, বাম দিকের দুই হাতে শঙ্খ ও চক্র, ডান দুই হাতে পুস্তক ও লেখনী ধারণকারী সেই সিদ্ধিদাতা শ্রীগণেশকে আরাধনা করি।
প্রণাম মন্ত্র:
একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদর গজাননম।/বিঘ্নবিনাশকং দেবং হেরম্বং পনমাম্যহম।।/ওঁ সর্ববিঘ্ন বিনাশয় সর্বকল্যাণ হেতবে।/পার্বতী প্রিয় পুত্রায় গণেশায় নমো নমঃ।।
এরপর---- সংকল্প:
দুর্গাপূজায় সংকল্প হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রারম্ভিক আচার। যেকোনো পূজা শুরুর আগে তামার পাত্রে বা কোশাকুশিতে জল, আতপ চাল, ফুল ও হরীতকী বা সুপুরি হাতে নিয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে নিজের নাম, গোত্র এবং পূজার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার প্রতিজ্ঞাকেই সংকল্প বলা হয়।
দুর্গাপূজার সংকল্প মন্ত্র:
ওঁ বিষ্ণুরোম্ তৎসদদ্য আশ্বিনে মাসি শুক্লে পক্ষে সপ্তম্যান্তিতিথৌ/অষ্টমান্তিতিথৌ....
(নিজের গোত্র) গোত্রঃ (নিজের নাম) দেবশর্মা
সর্বপাপক্ষয়পূর্ব্বক-দীর্ঘায়ুরারোগ্য-বিজয়-ধনধান্য-পুত্রপৌত্রাদ্যনবচ্ছিন্ন-
সন্ততি-মহালক্ষ্মী-লাভ-সর্ব্বাপচ্ছান্তি-মনোঽভীষ্টসিদ্ধি-শ্রীদুর্গাপ্রীতিকামো
বার্ষিক-শরৎকালীন-শ্রীমহাদুর্গাপূজা-কর্ম্মাহং করিষ্যামি।
সংকল্প সূক্ত মন্ত্র:
সংকল্প করার পর সেই সংকল্প যেন নির্বিঘ্নে এবং সফলভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্য হাত জোড় করে এই মন্ত্রটি পাঠ করে হাতের জল মাটিতে বা তাম্রপাত্রে ঢালতে হয়:
ওঁ যজ্জাগ্রতো দূরমুদৈতি দৈবং তদু সুপ্তস্য তথৈবৈতি।
দূরঙ্গমং জ্যোতিষাং জ্যোতিরেকং তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু।।
অর্থ: জাগ্রত অবস্থায় মানুষের মন যেভাবে দূরে চলে যায়, সুপ্ত বা ঘুমন্ত অবস্থাতেও তেমনি ঘুরে বেড়ায়। এই দূরগামী মন, যা সমস্ত ইন্দ্রিয়ের জ্যোতি বা চালিকাশক্তি— তা যেন কল্যাণকর বা শুভ সংকল্পে নিয়োজিত থাকে।
সংকল্প পূরণের পর ভুলত্রুটি মার্জনার জন্য প্রার্থনা মন্ত্র (বিষ্ণু স্মরণ)
ওঁ মাধবো মাধবো বাচি মাধবো মাধবো হৃদি।
স্মরন্তি সাধবঃ সর্ব্বে সর্ব্বকার্য্যেষু মাধবম্।।
ওঁ বিষ্ণুঃ ওঁ বিষ্ণুঃ ওঁ বিষ্ণুঃ।।
এরপর শ্রীমহাদুর্গার ধ্যানমন্ত্র:
ওঁ জটাজূটসমাযুক্তামর্দ্ধেন্দুকৃতশেখরাম্।/লোচনত্রয়সংযুক্তাং পূর্ণেন্দুসদৃশাননাম্।।/অতসীপুষ্পবর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্।/নবযৌবনসম্পন্নাং সর্বাভরণভূষিতাম্।।/সুচারুদশনাং তদ্বৎ পীনোন্নতপয়োধরাম্।/ত্রিভঙ্গস্থানসংস্থানাং মহিষাসুরমর্দিনীম্।।/মৃণালয়ায়তৈর্বাহুভির্দশভিঃ সমলঙ্কৃতাম্।/ত্রিশূলং দক্ষিণং ধ্যেয়ং খড়্গং চক্রং ক্রমাদপি।।/তীক্ষ্ণবাণং তথা শক্তিং দক্ষিণেষু নিবেশয়েৎ।/খেটকং পূর্ণচাপঞ্চ পাশমঙ্কুশমেব চ।।/ঘণ্টাং বা পরশুং বাপি বামতঃ সন্নিবেশয়েৎ।/কৃত্বা তু কার্মুকং দেবীং বামতঃ সন্নিবেশয়েৎ।।/অধস্তাৎ মহিষং তদ্বদ্বিশিরস্কং প্রদর্শয়েৎ।/তদ্বীর্যসমুদ্ভূতং খড়্গপাণিং মহাশুরম্।।/হৃদি শূলেন নির্ভিন্নং নির্গদন্ত্রবিভূষিতম্।/রক্তরঞ্জিতনয়নাং ভ্রূকুটিভীষণাননম্।।/বেষ্টিতং নাগপাশেন জটাবদ্ধেন চঞ্চলা।/কণ্ঠলগ্নেন সিংহেন দেব্যাঃ পাদেন তাড়িতম্।।/অলকাবলীসংযুক্তাং সর্বকামপ্রদায়িনীম্।/দেবীরূপং চিন্তয়েচ্চ শত্রুক্ষয়করং পরম্।।
ধ্যানমন্ত্রের সহজ বাংলা অর্থ:
রূপ ও অলঙ্কার: মা দুর্গার মাথায় জটাজূট রয়েছে, কপালে অর্ধচন্দ্র শোভা পাচ্ছে। তিনি ত্রিনয়নী (তিনটি চোখ যুক্ত) এবং তাঁর মুখমণ্ডল পূর্ণিমার চাঁদের মতো দীপ্তিময়। তাঁর গায়ের রঙ অতসী ফুলের মতো সোনালী-হলুদ। তিনি চিরযৌবনা এবং সর্বপ্রকার অলঙ্কারে ভূষিতা। ভঙ্গিমা: দেবী ত্রিবঙ্কিম বা ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছেন এবং তিনি মহিষাসুরকে মর্দন (বধ) করছেন। মৃণালের (পদ্মের মৃণাল) মতো সুন্দর তাঁর দশটি বাহু। ডান দিকের পাঁচ অস্ত্র: দেবীর ডান দিকের হাতগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে—ত্রিশূল, খড়্গ (তলোয়ার), চক্র, তীক্ষ্ণ বাণ (তীর) এবং শক্তি নামক অস্ত্র। বাম দিকের পাঁচ অস্ত্র: বাম দিকের হাতগুলোতে রয়েছে—খেটক (ঢাল), ধনুক, পাশ (নাগপাশ), অঙ্কুশ এবং ঘণ্টা (বা কুঠার)।
* নিচের দৃশ্যপট: দেবীর পায়ের নিচে মস্তকহীন এক মহিষ রয়েছে। সেই মহিষের শরীর থেকে খড়্গ হাতে এক মহাশক্তিশালী অসুর (মহিষাসুর) বের হয়ে আসছে। দেবীর ত্রিশূল সেই অসুরের বুকে বিদ্ধ হয়েছে এবং অসুরের অন্ত্র বা নাড়িভুঁড়ি বাইরে বেরিয়ে এসেছে। অসুরের চোখ রক্তবর্ণ এবং রাগে ভ্রূ কুঞ্চিত। বাহন সিংহ ও নাগপাশ: অসুরটি নাগপাশে আবদ্ধ এবং দেবীর বাহন সিংহ তার ঘাড়ে কামড়ে ধরেছে। দেবীর ডান পা সিংহের পিঠে এবং বাম পা অসুরের বুকের ওপর স্থাপিত।
এরপর ধূপ-দীপকে চন্দন ও পুস্প দিয়ে এই মন্ত্রে পবিত্র করে নিতে হবে:
ওঁ জয়ধ্বনি মন্ত্র মাতঃ সর্ববিঘ্নবিনাশিনী।/আরতিং তে করিষ্যামি গৃহাণ পরমেশ্বরি।।
এরপর একে একে সব নিবেদন করতে হবে: যেমন— ধূপ-দীপ নিবেদন, পুষ্পমাল্য অর্পণ, বস্ত্র (বিকল্পে উত্তরীয়) অর্পণ, অলঙ্কার, মধুপর্ক, নৈবেদ্য, আচমনীয় জল ও তাম্বুল।
ধূপ নিবেদন মন্ত্র: ওঁ বনস্পতি-রসোদ্ভূতো গন্ধাঢ্যো গন্ধউত্তমঃ।/আঘ্রেয়ঃ সর্বদেবানাম্ ধূপোঽয়ং প্রতিগৃহ্যতাম্।।/এষ ধূপঃ ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
সহজ অর্থ: হে মা মহামায়া! বনস্পতির (বৃক্ষ বা উদ্ভিদ) রস থেকে উৎপন্ন, অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত এবং সমস্ত দেবতাদের অত্যন্ত প্রিয় এই ধূপ আমি আপনার উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। আপনি দয়া করে এই ধূপের সুগন্ধ গ্রহণ করুন।
দীপ নিবেদন মন্ত্র: ওঁ সুপ্রকাশো মহাদীপঃ সর্বতস্তিমিরোৎসহঃ।/সবাহ্যাভ্যন্তরং জ্যোতির্দ্দীপোহয়ং প্রতিগৃহ্যতাম্।।/এষ দীপঃ ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
সহজ অর্থ: হে দেবী! যা সুন্দর আলো ছড়ায়, চারদিকের সমস্ত অন্ধকারকে দূর করে এবং বাইরের ও ভেতরের সমস্ত স্থানকে আলোকিত করে—এমন এই মহাদীপ বা প্রদীপ আমি আপনার চরণে উৎসর্গ করছি। আপনি কৃপা করে এটি গ্রহণ করুন।
দেবীর পুষ্পমাল্য নিবেদন মন্ত্র:
ওঁ সূত্রেন গ্রথিতং মাল্যং নানাপুষ্পসমন্বিতম্।/শ্রীযুক্তং সুগন্ধাঢ্যং গৃহাণ পরমেশ্বরি।।/ইদং পুষ্পমাল্যং ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
বস্ত্র অর্পণ ও দানের মন্ত্র:
শীতোষ্ণবাতসন্ত্রাণং লজ্জায়ারণং পরম্।/দেয়ালংকারণং বস্ত্রং অতঃ শান্তিং প্রয়চ্ছ মে॥
দুর্গা বা অন্যান্য দেবীর পূজায় বস্ত্র দেওয়ার সময় এই মন্ত্রটিও প্রচলিত আছে:
বস্ত্রং চ সোমদৈবতং লজ্জায়াস্তু নিবারণম্।/ময়া নিবেদিতং ভক্ত্যা গৃহাণ পরমেশ্বরি॥
দেবী দুর্গার বস্ত্র নিবেদন মন্ত্র আরো একটি—
ওঁ বহুতন্তুসমাযুক্তং পট্টসূত্রাদিনিৰ্ম্মিতম্।/বাসো দেবি সুশুক্লঞ্চ গৃ হাণ বরবর্ণিনি।।/ওঁ তন্তুসন্তানসন্নন্ধং রঞ্জিতং রাগবস্তুনা।/দুর্গে দেবি ভজপ্রীতিং বাসস্তে পরিধীয়তাম্॥/ইদং বস্ত্রম্ ওঁ হ্রীং শ্রীশ্রীভগবদ্দুর্গায়ৈঃ নিবেদয়ামি।
দেবীর অলঙ্কার নিবেদন মন্ত্র:
ওঁ রত্নকঙ্কণবৈডূর্য্য-মুক্তাহারাদিকানি চ।/ভূষণানি বিচিত্রাণি প্রীত্যর্থং প্রতিগৃহ্যতাম্।।/এতদ্ আভরণং (অলঙ্কারং) ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
দেবীর মধুপর্ক নিবেদন মন্ত্র:
ওঁ কাংস্যেন কাংস্যপিহিতং দধিসর্পির্জলান্বিতম্।
মধুনা চ সমাযুক্তং মধুপর্কং গৃহাণ মে।।
এতন্মধুপর্কং ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
অর্থ: হে মা, কাংস্য পাত্রে (কাঁসার বাটিতে) রাখা দধি, ঘৃত, জল শর্করা এবং মধুর এই পবিত্র সংমিশ্রণ—যা মধুপর্ক নামে পরিচিত, তা আপনি অনুগ্রহ করে গ্রহণ করুন।
দেবীর নৈবেদ্য নিবেদন মন্ত্র:
ওঁ ভক্ষ্যং ভোজ্যঞ্চ লেহ্যঞ্চ পেয়ঞ্চ চোষ্যমেব চ।/ময়া নিবেদিতং ভক্ত্যা নৈবেদ্যং প্রতিগৃহ্যতাম্।।/এষ সচন্দন-পুষ্প-তুলসীপত্রাদি-যুক্ত-মহানৈবেদ্যাদি (বা নৈবেদ্যং) ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
অর্থ: হে দেবী, চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়—এই পঞ্চপ্রকার সুস্বাদু খাদ্য উপাদান আমি ভক্তিভরে আপনার উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। আপনি দয়া করে এই নৈবেদ্য গ্রহণ করুন।
প্রাণায়াম মন্ত্র (ভোগ গ্রহণের জন্য নিবেদন)
নৈবেদ্য বা ভোগ নিবেদনের পর দেবী যেন তা গ্রহণ বা আস্বাদন করেন, সেজন্য ডান হাত দিয়ে দেবীর মুখের দিকে বাতাস দেওয়ার মতো মুদ্রা করে এই পাঁচটি বিশেষ মন্ত্র পাঠ করতে হয়:
ওঁ প্রাণায় স্বাহা। ওঁ অপানায় স্বাহা। ওঁ ব্যানায় স্বাহা। ওঁ উদানায় স্বাহা। ওঁ সমানায় স্বাহা।।
দেবীকে আচমনীয় জল নিবেদন মন্ত্র:
নৈবেদ্য নিবেদনের পর দেবীকে মুখ ধোয়ার ও হাত ধোয়ার জল উৎসর্গ করার সময় (নিয়ম: কোশাকুশি বা একটি সুন্দর পাত্র থেকে সামান্য জল দেবীর সম্মুখস্থ পাত্রে ঢেলে দিতে হয়।) এই মন্ত্রটি পাঠ করতে হয়:
ওঁ কপূর-বাসিতং তোয়ং মন্দাকিন্যঃ সমাহৃতম্।/আচম্যতাং মহাদেবি ময়া ভক্ত্যা নিবেদিতম্।।/ইদমাচমনীয়ং ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
সহজ অর্থ: হে মহাদেবী! গঙ্গা (মন্দাকিনী) থেকে সংগৃহীত এই কর্পূর-সুবাসিত পবিত্র জল আমি ভক্তিভরে আপনার উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। আপনি দয়া করে আচমন (মুখ প্রক্ষালন) করুন।
আচমনীয় জল দেওয়ার পর দেবীকে লবঙ্গ, এলাচ ও সুপারি যুক্ত সাজা পান বা তাম্বুল নিবেদন করতে হয়।
দেবীকে তাম্বুল (পান-সুপারি) নিবেদন মন্ত্র:
ওঁ তাম্বুলং চূর্ণসংযুক্তং ক্রমুকাদ্ধিসমন্বিতম্।/কপূরৈলা-লবঙ্গাদ্যৈর্ন্ময়া ভক্ত্যা নিবেদিতম্।।/এষ তাম্বুলঃ ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
সহজ অর্থ: হে মা মহামায়া! চুন, সুপারি, কর্পূর, ছোট এলাচ এবং লবঙ্গ সহযোগে সুসজ্জিত এই তাম্বুল বা পান আমি ভক্তিভরে আপনার চরণে অর্পণ করছি। আপনি তা গ্রহণ করুন।
এরপর অঞ্জলি— তিন বার তিনরকম মন্ত্র, আবার সপ্তমী অষ্টমী নবমী ও দশমীর মন্ত্রে কিছু কিছু পার্থক্য বা ভিন্নতা আছে।
মহাসপ্তমী পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র:
প্রথম অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ মহিষঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনি।/আয়ুরারোগ্যবিজয়ং দেহি দেবি নমোঽস্তু তে।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ নমঃ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
দ্বিতীয় অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।/শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোঽস্তু তে।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ নমঃ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
তৃতীয় অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ আয়ুর্দ্দেহি যশো দেহি ভাগ্যং ভগবতি দেহি মে।/পুত্রান্ দেহি ধনং দেহি সর্বান্ কামাংশ্চ দেহি মে।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ নমঃ দক্ষযজ্ঞবিনাশিন্যে মহাঘোরায়ৈ যোগিনীকোটিপরিবৃতায়ৈ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
দুর্গা প্রণাম মন্ত্র: (অঞ্জলি প্রদান সম্পন্ন করার পর)
ওঁ জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।/দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোঽস্তু তে।।
অর্থ: হে জয়দাত্রী, সর্বপাপহারিণী, কল্যাণময়ী, সর্বশক্তিমান, সময়ের অতীত এবং জগতের ধারণকর্ত্রী দেবী দুর্গা, আপনাকে আমার পরম প্রণাম।
সপ্তমী পূজার বিশেষ স্তুতি মন্ত্র
ওঁ দেহি সৌভাগ্যমারোগ্যং দেহি মে পরমং সুখম্।/রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।।
অর্থ: হে মা, আমাকে সৌভাগ্য ও আরোগ্য দান করো। পরম সুখ দাও। আমার আধ্যাত্মিক রূপ ও বিজয় নিশ্চিত করো, যশ বৃদ্ধি করো এবং আমার ভেতরের সমস্ত অশুভ শক্তি বা শত্রুকে বিনাশ করো।
মহাঅষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র: (দুর্গাপূজার সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।)
প্রথম অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ মহিষঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনি।/আয়ুরারোগ্যবিজয়ং দেহি দেবি নমোঽস্তু তে।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ নমঃ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
দ্বিতীয় অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।/শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোঽস্তু তে।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ নমঃ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
তৃতীয় অঞ্জলি মন্ত্র: (মহাঅষ্টমীর বিশেষ মন্ত্র)
ওঁ আয়ুর্দ্দেহি যশো দেহি ভাগ্যং ভগবতি দেহি মে।/পুত্রান্ দেহি ধনং দেহি সর্বান্ কামাংশ্চ দেহি মে।।/প্রচণ্ডপুত্রাদ্ধে দেবি মুণ্ডমালাবিভূষিতে।/নমামি সর্বদুঃখঘ্নে চামুণ্ডে সিংহবাহিনি।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ নমঃ দক্ষযজ্ঞবিনাশিন্যে মহাঘোরায়ৈ যোগিনীকোটিপরিবৃতায়ৈ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
মহাঅষ্টমীর প্রণাম মন্ত্র: (মন্ত্রটি তিনবার পাঠ করতে হয়)
ওঁ জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।/দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোঽস্তু তে।।
অর্থ: হে জয়দাত্রী, সর্বপাপহারিণী, কল্যাণময়ী, সর্বশক্তিমান, সময়ের অতীত এবং জগতের ধারণকর্ত্রী দেবী দুর্গা, আপনাকে আমার পরম প্রণাম।
মহানবমীর পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র:
[এটি শারদীয় দুর্গাপূজার অঞ্জলি পর্বের সমাপ্তি রূপ। নবমীর দিন দেবীকে মহিষাসুরমর্দিনী এবং সিদ্ধিদাত্রী রূপে পরম ভক্তিভরে বিদায়ী অর্ঘ্য দেওয়া হয়।]
প্রথম অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ মহিষঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনি।/আয়ুরারোগ্যবিজয়ং দেহি দেবি নমোঽস্তু তে।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ নমঃ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
দ্বিতীয় অঞ্জলি মন্ত্র:
ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।/শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোঽস্তু তে।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জliঃ নমঃ ভদ্রকাল্যৈ ভগবত্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
তৃতীয় অঞ্জলি মন্ত্র (মহানবমীর বিশেষ মন্ত্র):
নবমীর দিন তৃতীয় মন্ত্রে দেবীর মূল অসুরবিনাশিনী রূপ অর্থাৎ "মহিষাসুরমর্দিনী" রূপের নাম উচ্চারণ করে অঞ্জলি সমাপ্ত করা হয়:
ওঁ আয়ুর্দ্দেহি যশো দেহি ভাগ্যং ভগবতি দেহি মে।/পুত্রান্ দেহি ধনং দেহি সর্বান্ কামাংশ্চ দেহি মে।।/ওঁ শঙ্খকঙ্কণনূপুরমেখলা-গর্জ্জি নূপুর-রঞ্জিত-পাদযুগং।/মহিষাসুরমর্দ্দন-নাশন-কারিণি দেবি নমোঽস্তু তে।।/এষ সচন্দন-পুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ শ্রীমহিষাসুরমর্দিন্যৈ দুর্গায়ৈ নমঃ।।
মহানবমীর প্রণাম মন্ত্র:
ওঁ জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।/দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোঽস্তু তে।।/নমঃ সর্ব্বস্বরূপে সর্ব্বেশে সর্ব্বশক্তি সমন্বিতে।/ভয়েভ্যস্ত্রাহি নো দেবি দুর্গে দেবি নমোঽস্তু তে।।
[দশমীতে বাইরের ভক্তবৃন্দ অঞ্জলি না দিলেও ঘরে ব্রতীরা অঞ্জলি দেন। দশমীর অঞ্জলি শেষে লেখা হল।]
আরতি:
মহিষাসুরমর্দিনী স্তোত্রম্ (জনপ্রিয় অংশ):
অয়ি গিরিনন্দিনি নন্দিতমেদিনি বিশ্ববিনোদিনি নন্দমুতে।/গিরিবরবিন্ধ্যশিরোধিনিবাসিনি বিষ্ণুবিলাসিনি জিষ্ণুনুতে।।/ভগবতি হে শিতিকণ্ঠকুটুম্বিনি ভূরিকুটুম্বিনি ভূরিকৃতে।/জয় জয় হে মহিষাসুরমর্দ্দিনি রম্যকপর্দ্দিনি শৈলসুতে।।
বাংলায় দেবীর সহজ আরতি গান/স্তব:
নমো নমো মহামায়ে জয় দুর্গে দুর্গতিনাশিনী।/দশপ্রহরণধারিণী মাগো সিংহবাহিনীবাসিনী।।/ধূপ-দীপে তোমায় আরতি করি ওগো গো মা দয়াময়ী।/কপালে চন্দ্রবদন মাগো তুমি সর্বজয়জয়ী।।/ভক্তিভরে ডাকি তোমায় দাও মা চরণে স্থান।/সংসারের সব মায়া কাটিয়ে করো মা পরিত্রাণ।।
এরপর প্রদীপ ছোঁয়া (বা আরতির আলো নেওয়া) হলো আরতি বা পূজা শেষ হওয়ার পর একটি অত্যন্ত পবিত্র ও আধ্যাত্মিক লৌকিক আচার।
পুজো শেষে— অপরাধভঞ্জন ও ক্ষমা প্রার্থনা মন্ত্র: হাত জোড় করে চোখ বন্ধ করে দেবীর সামনে এই মন্ত্রটি পাঠ করতে হয়:
ওঁ যদক্ষরং পরিভ্রষ্টং মাত্রাহীনঞ্চ যদ্ভবেৎ।/পূর্ণং ভবতু তৎ সর্বং ত্বৎপ্রসাদাৎ মহেশ্বরি।।/ওঁ মন্ত্রহীনং ক্রিয়াহীনং ভক্তিহীনং জনার্দন (বা সুরেশ্বরি)।/যৎপূজিতং ময়া দেবি পরিপূর্ণং তদস্তু মে।।
সহজ অর্থ: হে মহেশ্বরী (পরমেশ্বরী)! মন্ত্র উচ্চারণে যদি কোনো অক্ষর বা মাত্রা বাদ পড়ে থাকে বা ভুল হয়ে থাকে, তোমার অসীম কৃপায় তা যেন পূর্ণতা পায়। হে দেবী, আমার না আছে মন্ত্রের জ্ঞান, না জানি সঠিক ক্রিয়াবিধি, আর আমার অন্তরে ভক্তিরও অভাব রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি যেভাবে তোমার পূজা করেছি, দয়া করে তা পরিপূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করো।
শ্রীশ্রীদুর্গা অপরাধক্ষমা পন স্তোত্রম্ (সংক্ষিপ্ত রূপ): শাস্ত্রীয় মতে, দেবী দুর্গার কাছে নিজের সমস্ত অপরাধের ক্ষমা চাইতে এই শ্লোকটি অত্যন্ত ফলদায়ক:
ওঁ অপরাধসহস্রাণি ক্রিয়ন্তেঽহর্নিশং ময়া।/দাসোহয়মিতি মাং মত্বা ক্ষমস্ব পরমেশ্বরি।।
সহজ অর্থ: হে পরমেশ্বরী মা! দিন-রাত আমার দ্বারা হাজারো অপরাধ হয়ে চলেছে। আমাকে তোমার অত্যন্ত সাধারণ এক সন্তান বা সেবক মনে করে আমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করো।
ভুলত্রুটি মার্জনা ও বিষ্ণু স্মরণ:
ক্ষমা প্রার্থনার শেষে পূজার সমস্ত ফল যেন ভগবানের চরণে পৌঁছায়, সেজন্য হাত জোড় করে এই মন্ত্রটি তিনবার বলা হয়:
ওঁ কায়েন বাচা মনসেন্দ্রিয়ৈর্বা বুদ্ধ্যাত্মনা বা প্রকৃতেঃ স্বভাবাৎ।/করোমি যদ্যৎ সকলং পরস্মৈ নারায়ণায়েতি সমর্পয়ামি।।/ওঁ বিষ্ণুঃ ওঁ বিষ্ণুঃ ওঁ বিষ্ণুঃ।।
সহজ অর্থ: আমার শরীর, বাক্য, মন, ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি অথবা প্রকৃতির স্বভাববশত আমি জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে যা কিছু করেছি, তার সমস্ত ফল আমি পরমেশ্বর ভগবানের চরণে সমর্পণ করলাম।
শ্রী শ্রীদুর্গার অষ্টোত্তর শতনাম
শ্রী পশুপতি চট্টোপাধ্যায়, কাব্যবিনোদ কর্তৃক সঙ্কলিত
জগতের জন তোমা দুর্গা নামে জানে। ১
দুর্গানাম প্রচলিত এ তিন ভুবনে।। ২
ভক্তগণ দিবানিশি বলে মা শঙ্করী। ৩
দেবগণ নাম তব দেন সুরেশ্বরী।। ৪
মহারাত্রি মহোদরী কর মোরে দয়া। ৫
মহাদেবপ্রিয়া নাম কৃত্তিবাস প্রিয়া।। ৬
পন্ডিতেরা নাম দিল কপাল মালিকে। ৭
কেহ বলে কৃপা কর জয় মা কালিকে।। ৮
দয়া করি দয়াময়ী ত্রিদিব-জননী। ৯
নিশাপতি নাম দিল কাল-করালিনী।। ১০
বিশ্ববাসী বলে উমা জগত-জননী। ১১
সখিগণ নাম রাখে মহেশগৃহিণী।। ১২
কংসধামে নাম দিল তব মহামায়া। ১৩
কালজায়া হেতু নাম দিল কালজায়া।। ১৪
যমপুরে কহে তোমা কৃতান্ত দলনী। ১৫
ভক্তবৃন্দ বলে তোমা মাগো কাত্যায়নী।। ১৬
নারায়ণ নাম রাখে সর্ববিশ্বোদরী। ১৭
শুভকার্যে সকলেই কহে শুভঙ্করী।। ১৮
দেবলোকে নাম তব হইল ঊর্ব্বশী। ১৯
আর এক রূপের নাম হইল ষোড়শী।। ২০
শ্রীমন্ত নাম দিল কল্যাণী কমলে। ২১
গায়ত্রী নাম তব কহেন পাতালে।। ২২
মাতঙ্গী আর এক নাম রাখিল সকলে। ২৩
মহেশ নিকটে তুমি হইলে বগলে।। ২৪
পবন রাখিল নাম ভুবন-ঈশ্বরী। ২৫
রাজগণ নাম দিল রাজ-রাজেশ্বরী।। ২৬
কেহ বলে ক্ষান্তি ক্ষেম দেবী ক্ষেমঙ্করী। ২৭
মহিষমর্দিনী নাম দিল অসুরারি।। ২৮
ছিন্নমস্তা নামে নিজ শিরচ্ছিন্ন কর। ২৯
দৈত্যদর্প নিসুদিনী নাম তুমি ধর।। ৩০
দেবদেবীগণ কহে বিরিঞ্চি-নন্দিনী। ৩১
পাপীগণ কহে দেবী পাপবিনাশিনী।। ৩২
দেবী দিগম্বরী নাম কহিলেন সবে। ৩৩
দুর্গে দুর্গে অরি তাই নাম হয় শিবে।। ৩৪
অপরাজিতা নাম দিল যতেক ব্রাহ্মণ। ৩৫
উগ্রচন্ডা নাম রাখে পবন-নন্দন।। ৩৬
ঈশ্বরী তোমার নাম দিল দিনমণি। ৩৭
গণপতি মাতা তেঁই গণেশ জননী।। ৩৮
কেহ ডাকি বলে তোমা এস মা ঈশানী। ৩৯
ইন্দ্রপুরে সকলেই কহে যে ইন্দ্রাণী।। ৪০
ভবেশ-ঘরণী মাগো অগতির গতি। ৪১
সর্বাণী আরেক নাম রাখে রাধাপতি।। ৪২
জগত্তারিণী নাম রাখে বিশ্বপতি। ৪৩
সর্বসুখদাত্রী তাই তুমি ভগবতী।। ৪৪
অন্নে পূর্ণ ছিলে যবে অন্নপূর্ণা নাম। ৪৫
মহেশ্বরী নাম তব রাখেন শ্রীরাম।। ৪৬
প্রকৃতির অংশজাতা ব্রহ্মান্ড-জননী। ৪৭
শিব অঙ্কলক্ষ্মী তুমি শিবের শিবানী।। ৪৮
সহস্র প্রণাম তব সত্যসনাতনী। ৪৯
এ দাসের কৃপা কর তুমি মা ভবানী।। ৫০
চন্ডী নাম হইল তব চন্ডীমন্ডপ।৫১
এলোকেশী নাম দিল নহুষাদি ভূপে।। ৫২
মায়া মহোদরী নাম রাখিল অর্যমা। ৫৩
গঙ্গা রাখিলেন মহেশ্বরী হররমা।। ৫৪
মুনিগণ নাম তব রাখেন সারদা। ৫৫
বালখিল্য নাম তাই দিলেন বরদা।। ৫৬
আর এক নাম তব সুখদা অন্নদা। ৫৭
মৃগেশবাহিনী শিব কহিছেন সদা।। ৫৮
মহেশের ঘরে থাক মহেশ ভাবিনী। ৫৯
কালিকে কালিকা শ্যামা কহেন ইন্দ্রাণী।। ৬০
সুরেশ বন্দিনী বামা কামাখ্যা রুদ্রাণী। ৬১
বৃন্দাদূতী নাম রাখে হরা হররানী।। ৬২
উদ্ধব কহিল তোমা শমন-ত্রাসিনী। ৬৩
দেবগণ কহে সবে অরিষ্ট-নাশিনী।। ৬৪
দাক্ষায়ণী নাম তব রাখে সরস্বতী। ৬৫
হিমাচলে নাম তব হইল পার্বতী।। ৬৬
শঙ্করী সুন্দরী বলি কহে মন্দোদরী। ৬৭
শিব সাথে বিরাজিতা শিব-সহচরী।। ৬৮
শিবদারা এক নাম রাখে স্বর্গপুরী। ৬৯
শান্তিদানে নাম তব হয় কান্তিকরী।। ৭০
শুভঙ্করী শুভকার্যে হও কপালিনী। ৭১
বলে সবে ওমা তারা ত্রিলোকতারিণী।। |৭২
প্রিয়ঙ্করী এক নাম রাখে দেবমণি। ৭৩
দুর্বাসা রাখিল নাম মৃগাঙ্গ আননী।। ৭৪
ভীমে বলি ডাকিছেন ক্রোধী জহ্নুমুনি। ৭৫
প্রহ্লাদ রাখিল নাম গিরিশবন্দিনী।। ৭৬
রাখালেরা নাম দিল গৌমাতা গৌরী। ৭৭
গান্ধারী রাখিল নাম গোপেশকুমারী।। ৭৮
গিরীন্দ্রনন্দিনী নাম দিল ব্রজেশ্বরী। ৭৯
কেহ বা বলেন তোমা গোপেশ কুমারী।। ৮০
আর এক নাম তব গজেন্দ্র জননী। ৮১
বিশ্বামিত্র নাম দিল গোবিন্দ-ভগিনী।। ৮২
দৈবকী রাখিল নাম যোগেশ যোগিনী। ৮৩
কেহ কেহ নাম রাখে পরা-পরায়ণী।। ৮৪
দেব দাক্ষায়ণী দক্ষ-যজ্ঞ বিনাশিনী। ৮৫
শিবা শাকম্ভরী নাম রাখে ঔর্বমুনি।। ৮৬
ত্রিজগৎ দুঃখ নাশি ত্রিতাপহারিণী। ৮৭
নরগণ কহে তোমা ভবেতে ভবানী।। ৮৮
কেহ ডাকিছে বলি এস মা ব্রহ্মাণী। ৮৯
আর এক নাম তব কালী কপালিনী।। ৯০
শিবসাথে সততই শিব-নিতম্বনী। ৯১
অরি বিনাশিনী তুমি অরিষ্ট-স্তম্ভনী।। ৯২
ভরণী ভাবিনী তুমি ভব মনোহরা। ৯৩
কৌমারী অপর নাম ভব শিবকরা।। ৯৪
জয়াবতী নাম তব অর্পণা রাখিল। ৯৫
অন্নদা বলিয়া নাম অন্নদা যে দিল।। ৯৬
সর্ব সিদ্ধিদাত্রী বলি ভৃগু নাম রাখে। ৯৭
আয়ান কহিল তোমা নৃমুন্ডমালিকে।। ৯৮
চামুন্ডে চন্ডিকা নামে ত্রিভুবনে খ্যাত। ৯৯
নারায়ণী নাম তব জগৎ বিখ্যাত।। ১০০
দেবী দাক্ষায়ণী দক্ষযজ্ঞ বিনাশিনী। ১০১
কামদেব নাম রাখে মম্মথমোহিনী।। ১০২
গিরিরাজ গৃহে তুমি মেনকা দুলালী। ১০৩
পাতালেতে ছিল নাম দেবী ভদ্রকালী।। ১০৪
দানবদলনী মাতা বৈষ্ণবী-জৃম্ভিণী। ১০৫
মহাকালী নাম দিল বিন্ধ্য নৃপমণি।। ১০৬
জয়া নাম রাখিলেন সঙ্গের সঙ্গিনী। ১০৭
শেষ নাম হ’ল তব দেবী প্রমথিনী।। ১০৮
ভক্তিভরে তব পদ করিয়া শরণ।
অষ্টোত্তর শতনাম করিনু বর্ণন।।
যেই জন এই নাম করিবে পঠন।
সুনিশ্চিত হবে তার দুর্গতি মোচন।।
যার ঘরে এই বই রহে বিদ্যমান।
দুর্গা বরে হবে তার পূর্ণ মনস্কাম।।
যাত্রাকালে দুর্গা দুর্গা স্মরে যেই জন।
সর্ব কর্মে জয়ী তিনি সুনিশ্চিত হন।।
মাতৃজ্ঞানে যেইজন রমণীরে করে।
দেবী মহামায়া এসে কোল দেন তাঁরে।।
নারীমাত্র পৃথিবীর অংশ মহামায়া।
তাহার সন্মানে মাতা দেন পদচ্ছায়া।।
নমো দেবী মহামায়া ত্রিদিব-জননী।
নমো মাতা চন্ডীদেবী জগৎ-তারিণী।।
নিস্তার কর গো মোরে ওমা নিস্তারিণী।
সর্ব কর্মে যশঃ দেহ তুমি মা ভবানী।।
যেই জন এক মনে দুর্গা নাম ডাকে।
শত্রু ভয় থাকে নাকো রক্ষা কর তাকে।।
দুর্গা নামে দুঃখ নাশ শাস্ত্র হেন কয়।
জনম মরণ নাশে নাহি যমভয়।।
নমো নমো দেবী দুর্গা কাল-নিবারিণী।
মহাকাল মনোহরা মহিষমর্দিনী।।
অসুর সংহার কর দনুজদলনী।
কালরাত্রি কালীমাতা তুমি করালিনী।।
নমো হিমাচল কন্যা স্কন্দ-মাতৃ ভীমা।
শক্তিময়ী মাতা তোমা দিতে নারি সীমা।।
নমো নমো দুর্গাদেবী মহেশ্বরপ্রিয়ে।
এ দীনেরে রক্ষ পদে কৃপা বিতরিয়ে।।
এরপর আসে বিজয়া দশমী, দেবী দুর্গার মণ্ডপ থেকে বিদায় এবং বাপের বাড়ি থেকে কৈলাসে ফিরে যাওয়ার দিন। এই দিন সকালে দেবীর দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটে এবং বিকেলে দেবী অপরাজিতার পূজা করা হয়। কিন্তু বাড়ির পুজোয় বিষয়টি সংক্ষেপে হল:
দশমী বিহিত পূজা: সপ্তমীর মতো দশমীর সকালেও দেবীর সংকল্প করে সংক্ষেপে পূজা করা হয়। এই দিন দেবীকে শীতলা ভোগ বা দধিকর্মা (খই, দই, চিঁড়ে, মিষ্টির মিশ্রণ) নিবেদন করা হয়।
দাধিকর্মা ভোগ নিবেদনের মন্ত্র:
ওঁ দধ্যোদন-সমায়ুক্তং ক্ষীর-খন্ড-ঘৃতান্বিতম্।/ময়া নিবেদিতং ভক্ত্যা দাধিকর্ম্মং গৃহাণ মে।।/ইদং দাধিকর্ম্ম-নৈবেদ্যং ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।।
সহজ অর্থ: হে মা মহামায়া! দধি (দই), অন্ন (খই/চিঁড়ে), ক্ষীর, চিনি এবং ঘৃত মিশ্রিত এই পবিত্র 'দাধিকর্মা' ভোগ আমি ভক্তিভরে আপনার উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি। আপনি প্রীত হয়ে দয়া করে এই ভোগ গ্রহণ করুন।
[নিবেদনের পর পূর্বের ন্যায় দেবীর উদ্দেশ্যে 'ওঁ প্রাণায় স্বাহা, ওঁ অপানায় স্বাহা...' মন্ত্রে পঞ্চপ্রাণ মুদ্রা দেখাতে হয়।]
ঘট নাড়ানো (ঘট বিসর্জন): দর্পণ বিসর্জনের পর ঘটে ফুল ও চাল দিয়ে ঘটটিকে সামান্য নাড়িয়ে উত্তর দিকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বিসর্জন মন্ত্র পাঠ করা হয়।
ঘট বিসর্জনের মূল মন্ত্রটি হলো:
"গচ্ছ গচ্ছ সুরশ্রেষ্ঠে স্থানং পরমেশ্বরী।
পূজারাধনকালে চ পুনর্গমনায় চ।।"
সহজ অর্থ: হে পরমেশ্বরী দেবি! আপনি আপনার পরম ধামে (কৈলাসে) গমন করুন। আবার যখন আগামী বছর আপনার পূজার শুভ সময় আসবে, তখন পুনরায় আমাদের মণ্ডপে ও হৃদয়ে ফিরে আসবেন।
এরপর ঘটের আমপল্লব দিয়ে পরিবারের সবার মাথায় শান্তিজল ছেটানো হয়। সধবা ব্রতীরা থালায় পান, সুপারি, মিষ্টি, সিঁদুর এবং প্রদীপ নিয়ে দেবীকে বরণ করেন। বরণ শেষে দেবীর সিঁদূর গ্রহণ করেন।
ঘট বিসর্জনের পর করণীয়:
ঘটটি নাড়ানোর পর ঘটের ভেতরের আমপল্লবটি তুলে নিয়ে দেবীর ঘটে থাকা পবিত্র জল সবার মাথায় এবং ঘরের চারদিকে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এই জল ছিটানোর সময় শান্তি ও আরোগ্যের জন্য এই মন্ত্রটি বলা হয়:
ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।/শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোঽস্তু তে।।/ওঁ সুরূপা চ সুশীলা চ সুভগা চ বরাননে।/নমস্তেঽস্তু মহামায়ে সর্ব্বকামপ্রদায়িনী।।/ওঁ জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।/দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোঽস্তু তে।।
এর সাথে এই ছোট শান্তিবচনটি বলা হয়:
ওঁ আপদাং অপহর্তারং দাতারং সর্বসম্পদাম্।/লোকাভিরামং শ্রীরামং ভূয়ো ভূয়ো নমাম্যহম্।।/ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ।।
মনে রাখতে হবে: শান্তিজল কিন্তু আলাদা করে তৈরি করতে হয় না। পূজার শুরু থেকে যে মূল ঘটটি (মঙ্গলঘট) বেদীতে স্থাপন করা থাকে, তার ভেতরের জলই পূজা শেষে পরম পবিত্র শান্তিজল (বা অভিষেক জল) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পূজার দিনগুলোতে প্রতিদিনের মন্ত্রোচ্চারণ, দেবীর আবাহন এবং উপাচার নিবেদনের মাধ্যমে সেই ঘটে আধ্যাত্মিক শক্তি ও ব্রহ্মতেজ সঞ্চারিত হয়।
মন চাইলে বিকেলের দিকে বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণে চালের গুঁড়ো দিয়ে অষ্টদল পদ্ম এঁকে নীল অপরাজিতা লতা বা গাছের পূজা করা হয়। বিশ্বাস—এই পূজা সমস্ত বাধা দূর করে জীবনে জয় এনে দেয়। পূজা শেষে সেই অপরাজিতা লতার ছোট অংশ পুরুষদের ডান বাহুতে এবং মহিলাদের বাম বাহুতে লাল সুতো দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়।
শুভ বিজয়া ও আশীর্বাদ: নিজ এলাকার প্রতিমা বিসর্জন শেষে ছোটরা গুরুজনদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয় এবং সমবয়সীদের সাথে কোলাকুলি ও মিষ্টি মুখ করা হয়। গুরুজনেরা এই সময় ধান-দূর্বা মাথায় দিয়ে বিশেষ দশমী আশীর্বাদ মন্ত্র পাঠ করেন।
১. দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের মূল আশীর্বাদ মন্ত্র:
"ওঁ আয়ুর্দ্রোণসুত শ্রীরামচন্দ্র বিজয়ো ভব।/ধনং ধনদস্য স্যাৎ কীর্তিঃ নারায়ণস্য চ।।/ঐশ্বর্যং নহুষস্য স্যাৎ গতিশ্চৈব মহাগতিঃ।/শৌর্য্যং জামদগ্ন্যস্য সমুদ্র ইব গাম্ভীর্যং।/ধৈর্যং চ ধৃতরাষ্ট্রস্য তদ্বদস্মাভি রাশির্বাঃ।।"
সহজ অর্থ: তোমার আয়ু যেন অশ্বত্থামার (দ্রোণপুত্র) মতো দীর্ঘ হয়। শ্রীরামচন্দ্রের মতো তুমি যেন জীবনে বিজয়ী হও। কুবেরের মতো ধন, নারায়ণের মতো কীর্তি এবং রাজা নহুষের মতো ঐশ্বর্য লাভ করো। পরশুরামের (জামদগ্ন্য) মতো শৌর্য, সমুদ্রের মতো গাম্ভীর্য এবং ধৃতরাষ্ট্রের মতো (কিংবা হিমালয়ের মতো) ধৈর্য ধারণ করার ক্ষমতা তোমার আসুক—এই আমাদের আন্তরিক আশীর্বাদ।
0 Comments.