- 10
- 0
অপরাজেয় ভালোবাসা
"তোর মুখটা একবারও আয়নার দেখেছিস কি? বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে যাস না । কুমড়োপটাশের মতো শরীর নিয়ে আর মুখে অসংখ্য বসন্তের দাগ নিয়ে তুই আমাকে প্রোপোজ করার সাহস কোথা থেকে পেলি!! তোর মতো ছেলেরা আমার বাড়ির চাকর হতে পারে কিন্তু মালিক হতে পারে না।"---- সুকন্যার মুখ থেকে এমন কথা শুনে দেবরাজের দুচোখে জল ঝরে পড়েছিল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল এই দাম্ভিক বড়লোকের মেয়েটিকে সে উচিত শিক্ষা দেবে। একদিন সেই তাকে ভালোবাসার কথা বলবে। যদি সে না পারে তবে এজীবনে কারোকে বিয়ে করবে না।
ডাঃ সুদীপ্ত রায়ের একমাত্র বোন সুকন্যা ছোট বেলা থেকে দাদা - বৌদির প্রচন্ড ভালোবাসায় মানুষ হয়েছিল। কোন অভাব কোনো দিন বুঝতে পারে নি সে। সে যখন খুব ছোট তখন তাঁর মা মারা যান। মায়ের শোকে বাবা কেমন হয়ে যান। দাদা-বৌদির কোনো মেয়ে না থাকায় মেয়ের মতোই তাকে বড় করেছেন। অতি ভালোবাসায় এমন জেদ ও অহংকার তৈরী হয়েছিল তার যে মানুষকে মানুষ হিসাবে জ্ঞান করত না। নিজেদের স্ট্যাটাসের নীচে থাকা মানুষদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করত সে। দাদা ও বৌদিকে এই ব্যবহার নিয়ে অনেকেই নালিশ জানিয়েও কোনো কাজ হয় নি। তারা তাদের বলতেন---" ছোট মানুষ তো কোথায় কি বলতে হয় জানে না। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। বাপের ঘরে কদিনই বা থাকবে , কার ঘরে পড়বে, কপালে কি থাকবে তা তো কেউ বলতে পারে না। তাই ওর মনে আঘাত দিয়ে আমারা ওকে কিছু বলতে চাই না। ছোট মানুষ হিসেবে ওকে আপনারা ক্ষমা করে দিন।" দাদার এই কথা শুনে তারা বলতেন --- " এমন লাই দেওয়া ভালো না দাদা। এতে আপনার বোনের স্পর্ধা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। কোনো দিন হয়তো মানুষ খুন করে বসবে। সেদিন বুঝবেন আজকের এই প্রশ্রয় দেওয়া মোটেয় ঠিক হয় নি। আপনার বোন ও আপনাদের ভালোর জন্য বলছি বোনকে শাসন করুন, নতুবা একদিন বড় বিপদ ঘটে যাবে। তখন হাহুতাশ করেও কোনো লাভ হবে না।" বোনের জন্য ডাক্তারবাবু ও তার বৌয়ের এমনসব অপমানজনক কথা শুনতে হত প্রতিনিয়ত। মাথানত হয়ে যেত তাদের।
দেবরাজ ছিল একজন কাঠ মিস্ত্রীর সন্তান। বি.এ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। হীরক নামের তার এক বন্ধু ছিল। সুকন্যাকে প্রথম এই কলেজেই দেখে ছিল সে। হীরকের মাধ্যমেই সে প্রেম নিবেদন করে। সুকন্যা হীরকের কথার কোন উত্তর দেয় নি। মনে একরাশ কষ্ট নিয়ে সুকন্যার বাংলা অনার্সের ঘরের সামনে মাথানত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত দেবরাজ। তার মনে আশা ছিল সুকন্যা একদিন হয়তো তার প্রস্তাব গ্ৰহন করবে। কিন্তু মেয়েদের মনের জটিলতার হদিস সে জানত না। তার এই আচরনের কথা একদিন সুকন্যা কলেজ অধ্যক্ষকে জানায়। অধ্যক্ষ দেবরাজকে ডেকে পাঠান। তিনি বলেন --- " তুমি কলেজের পরিবেশ নষ্ট করছ। এখানে পড়াশোনা করতে আসো না প্রেম করতে আসো? লজ্জা করে না বাবা - মার সম্মানহানি করতে। আজকের পর তোমার নামে কোন মৌখিক অথবা লিখিত অভিযোগ আসলে তোমাকে আমি কলেজ থেকে বের করে দেব। " এরপর দেবরাজ কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। তার মা তাকে বুঝিয়েও কলেজে পাঠাতে পারেন নি। তিনি কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছেলের কলেজে না যাওয়ার প্রকৃত কারন জানতে পারেন। তিনি অধ্যক্ষকে বলেন --- " স্যার, আমার ছেলে এমন নয়। নিশ্চয় কেউ ওর মগজ ধোলাই করছে। আমরা ওকে বাড়িতে বোঝাব, আশা করি ওই মেয়ের ছায়া পর্যন্ত ও মারাবে না। মায়ের কথা রাখতে দেবরাজ সুকন্যাকে ক্ষনিকের জন্য ভুলে যায়। একদিন সে মনে মনে ভাবে --- " সুকন্যার কাছে আমি হেরে যাব!! ওরা ধনী বলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তের কোনো মূল্য নেই। আমি জানি ভালোবাসা কোনো ভেদাভেদ মানে না। তবে ও আমায় একটুকুও ভালোবাসে না!! আমার ভালোবাসা ব্যর্থ হতে পারে না। আজ না হলে কাল ওকে আমার জীবনে আসতেই হবে।"
দুবছর সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। দুজনের জীবনেই অনেক কিছুই পাল্টে যায় । সুকন্যা বাংলা অনার্সে বিয়ে পাশ করে। দাদা-বৌ বিয়ে দেওয়ার জন্য সুপাত্র খুঁজতে শুরু করেন। দেবরাজ বাবার পয়সায় তখনো জীবন অতিবাহিত করে। মাঝে মাঝে সুকন্যার কথা মনে পড়লেও নিজেকে সামলে নেয় সে। একদিন চল্লিশ বছরের এক টাক মাথা ডাক্তারের সঙ্গে সুকন্যার বিয়ে ঠিক হয়। টাকা আছে তাই টাকেরও মূল্য আছে। সুকন্যার ছেলেটিকে পছন্দ হয় না। কিন্তু দাদা - বৌদি ঠিক করায় না-ও বলতে পারে নি সে। একদিন রাতে সুকন্যা স্বপ্ন দেখে তার বিয়ে হচ্ছে। মালাবদল, সিঁদুর দান হওয়ার পর পাত্রের মুখের সামনে থেকে ফুলের আচ্ছাদনটা সরিয়ে দেখে কলেজের সেই অখাদ্য ছেলেটি, দেবরাজ। চিৎকার করে লাফ দিয়ে ওঠে। সকলে ছুটে এলে ভয়ের স্বপ্ন দেখেছি বলে সে বিষয়টি ম্যানেজ করে নেয়। সকলে চলে গেলে খাটের উপর চুপ করে বসে সুকন্যা দেবরাজের সঙ্গে দেখা হওয়ার দিনগুলির কথা মনে করতে লাগে। সে ভাবে, "টাকার থেকে ভালোবাসা অনেক মূল্যবান। দেবরাজ হয়তো তাকে সত্যি সত্যিই খুব ভালোবাসে। সেদিন সে বুঝতে পারে নি। একজন অচেনা অজানা টাকা উপার্জনের যন্ত্রমানবের থেকে উচ্ছল প্রাণবন্ত ভালোবাসতে জানা মানুষকে বিয়ে করে সে বেশি সুখী হবে।" একদিন রাতে হঠাৎ সুকন্যার একটা ফোন এসেছিল দেবরাজের কাছে। খুব কষ্ট করেই নাম্বারটা সে জোগাড় করেছিল। ফোনটা ধরে দেবরাজ প্রচন্ড অবাক হয়েছিল। সুকন্যা তাকে বলেছিল --- " আমি সুকন্যা বলছি। তোমার ভালোবাসা আমি এতদিন বুঝতে পারি নি। গতকাল রাতে আমি বুঝেছি টাকার থেকে ভালোবাসা বড়। আশা করি তুমি এখনো আমায় ভালোবাসো। আমায় তুমি বিয়ে করবে? আগামী রবিবার আমার এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে হতে যাচ্ছে যাকে আমি ভালোবাসি না, চিনি না, জানি না। এই বিয়ে হলে আমি সুখী হব না। আমার বাড়ির লোকেদের সঙ্গে তোমার বাবাকে নিয়ে এসে বিয়ের কথা বলো। তোমার প্রতি আমার পূর্বের ব্যবহারের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।" সুকন্যা ফোনটা কেটে দেওয়ার পরও দেবরাজ কিছুক্ষণ রিসিভারটা ধরে রাখে। সে যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়ে। সেই দিন রাতে দেবরাজের একটুকুও ঘুম হয় না।
পরদিন দেবরাজ তার মাকে গতকাল রাতের ঘটনাটা জানায়। তার মা বাবাকে বিষয়টি জানান। দশজন আত্মীয় স্বজন নিয়ে দুই দিন পর দেবরাজের বাবা সুকন্যাদের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। এত লোক দেখে সুকন্যার বাড়ির লোকেরা অবাক হলেও সুকন্যা কিন্তু একটুকুও অবাক হয় না। সে বুঝতে পারে দেবরাজদের বাড়ির লোক তাদের দুজনের বিয়ের কথা বলতে এসেছেন। দেবরাজের বাবা কলেজ থেকে সুকন্যার ফোন করা পর্যন্ত সমস্ত বিষয়টি সুকন্যার দাদা - বৌদি এবং বাবার সামনে তুলে ধরেন। দুদিন বাদে বিয়ের কথা চিন্তা করে এবং দেবরাজ বেকার জানতে পেরে তারা এই সম্পর্কে অসম্মতি জানান। কিন্তু সুকন্যার মতামত নেওয়ার পর তারা রাজি হন। আগে ঠিক করা শুভ লগ্নেই তাদের চারহাত এক হয়ে যায়। বিধির বিধান কেউ খন্ডাতে পারে না।
সুকন্যার দাদা ডাক্তার সুদীপ্তর সহযোগিতায় মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কোর্স করে দেবরাজ। কঠোর পরিশ্রমে দেখতে দেখতে বহুদূর পৌঁছায় সে। নিজের উপার্জনে বাড়ি গাড়ি, শ্রীকৃষ্ণের মন্দির করে দেবরাজ। দুবছর পর দেবকন্যার জন্ম হয়। দেখতে দেখতে দেবকন্যা বড় হতে থাকে। তাদের একে অপরের ভালোবাসায় পরিবারে স্বর্গসুখ নেমে আসে। দুই পরিবারের মানুষেরা মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা রাগ- ক্ষোভ একেবারে ভুলে সকলকে আপন করে নেন। গুরুজনরা বুঝতে পারেন নিজেদের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সম্পর্কের চেয়ে ছেলে - মেয়ের পছন্দ করা সম্পর্ককে মেনে নিলে তারা বেশি সুখী হয়। ভালোবাসা মানুষকে বিপথে যেতে দেয় না।
0 Comments.