- 59
- 0
অসহিষ্ণুতা এক বড় অসুখ। ধীরে ধীরে গ্রাস করে চেতনার অলিগলি। বিচারবুদ্ধির গায়ে যেন ধুলোর পলেস্তারা জমে যায়। মানুষ যত আক্রান্ত হয়, তত গাঢ় কুয়াশা অস্পষ্ট করে দেয় সমস্ত ছবি। মন্দমতি, মন্দবুদ্ধির ভুলভুলাইয়ায় খানিক চক্কর কাটা। নিজের অজান্তেই কিছু ভুল, নাকি অন্যায় করে ফেলা। এ কি মতিভ্রম, নাকি অসফলতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে চেয়ে আরও একটা সংগঠিত অসফল অধ্যায়ের দৃশ্যকল্প?
সব ছেড়ে চলে যেতে হবে ভুবনডাঙার মাঠ পেরিয়ে অমৃতকুম্ভের সন্ধানে। তবু পেছনের জীবনের জন্য এত আসর সাজান, ধূপ জ্বালান, নিজের নামে হরির লুঠ! কতবার এভাবে ভিড় থেকে পৃথক হতে গিয়ে তাঁরা হারিয়ে গেছে রাতের আঁধারে। সাইক্লোন, ভূমিকম্প, বন্যায় মুছে গেছে অস্তিত্ব। অসহিষ্ণু আলোরা ক্রমশ অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দেয়। পা পিছলে গেলে দেখবে, সোজা খাদে গিয়ে পড়েছো। এই একা এগিয়ে যাওয়ার গল্পটা না হয় এবার বন্ধ হোক। এসো আরও বেঁধে বেঁধে থাকি। এক আকাশের নীচে ভাগ করে নিই রুটির টুকরো, শীতের কাপড় কিংবা ভরা জলসার কবিতা-গান—আরও কত কী!
কখনও কখনও নিজেরই ভিতর থেকে উঠে আসে এক অদৃশ্য অনমনীয়তা—যে অনমনীয়তা প্রশ্নকে ভয় পায়, অথচ উত্তর সাজিয়ে রাখে আগেই। তখন সত্যের মুখে জমতে থাকে সুবিধের ধুলো, বিবেকের দরজায় নেমে আসে দ্বিধার কুয়াশা। মানুষ নিজের তৈরি সেই শব্দজালে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ে যে ভুলকে আর ভুল বলে চিনতে পারে না; বরং ভুলেরই জন্য খুঁজে নেয় যুক্তির অলঙ্কার। এভাবেই জন্ম নেয় এক ধরনের বোধ-অন্ধতা—চোখ খোলা থাকে, অথচ দেখার ভিতর থেকে সরে যায় আলো।
তবু মানুষের ভিতর কোথাও একটি নরম জায়গা থেকে যায়—যেখানে মতের দেওয়াল এত উঁচু নয়, ভিন্নতার জন্য দরজা বন্ধ হয় না। সেখানে অন্যের কথা শুনে নেওয়া মানে নিজের কথা হারিয়ে ফেলা নয়; বরং নিজের ভাবনার পাশে আর-একটি ভাবনার জন্য সামান্য জায়গা করে দেওয়া। সেই সামান্য জায়গাটুকুই হয়তো সহিষ্ণুতার প্রথম আলো। আর আলো যখন একবার ভিতরে ঢোকে, তখন পরস্পরকে হারিয়ে দেওয়ার বদলে পাশাপাশি থাকার কথাটাও মনে পড়ে।
হয়তো সব মত এক হবে না, সব পথও এক দিকে যাবে না। তবু পথের ভিন্নতাকে শত্রুতা না বানিয়ে, কথার ভিন্নতাকে বিচ্ছেদের কারণ না করে, একটু থামা যায়, একটু শোনা যায়, একটু অন্যের চোখ দিয়েও পৃথিবীটাকে দেখে নেওয়া যায়। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত একা বাঁচার জন্য তৈরি নয়; তার চারপাশের মানুষগুলির হাসি-কান্না, ভুল-ভ্রান্তি, রাগ-অভিমান মিলিয়েই তো এই অসম্পূর্ণ অথচ সুন্দর পৃথিবী। তাই এত বিভাজন, এত বিরোধ, এত নিজেকে ঠিক প্রমাণ করার ক্লান্তি পেরিয়ে একবার যদি পাশাপাশি দাঁড়ানো যায়—
সকলে এক সাথে ভালো থাকার চেষ্টা করেই দেখি না! কী বলেন আপনারা, পারবোনা?
সকলে একসঙ্গে ভালো থাকার চেষ্টা করেই দেখি না! কী বলেন আপনারা, পারব না?
শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানাই সকলকে টেকটাচটকের পক্ষ থেকে।
ডঃ রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
0 Comments.