- 12
- 0
পরিবেশ: অরণ্য ও অন্তর্লোক
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রাক্কালে আমরা যখন প্রকৃতি ও পরিবেশের কথা বলি, তখন সাধারণত বনভূমি, নদী, পাহাড়, বাতাস কিংবা জীববৈচিত্র্যের প্রসঙ্গই সামনে আসে। অথচ পরিবেশের একটি গভীরতর অর্থও রয়েছে—মানুষের চিন্তা, আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সমগ্র পরিসরও পরিবেশেরই অংশ।
আজকের পৃথিবীতে ভোগের উৎসব যত বড় হয়েছে, ততই বেড়েছে বৈষম্য, প্রতিযোগিতা ও বিচ্ছিন্নতা। একদিকে অঢেল প্রাচুর্য, অন্যদিকে বঞ্চনার দীর্ঘ ছায়া। এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনীতির নয়, পরিবেশগত সংকটেরও উৎস। কারণ প্রকৃতির সম্পদের ওপর অতিরিক্ত দখলদারিত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষের মধ্যেকার দূরত্বও বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে প্রকৃতি এখনও মানুষের অনুভূতির সবচেয়ে প্রাচীন আশ্রয়। বাতাসের ছুটে চলা, নদীর অস্থিরতা, বৃষ্টির শব্দ কিংবা সন্ধ্যার আকাশ—এসবের মধ্যে মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, স্বপ্ন ও অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়। প্রকৃতি তাই কেবল দৃশ্য নয়, এক অন্তর্লোকের ভাষা।
কিন্তু মানুষের ভেতরেও আছে নানা অদৃশ্য সীমারেখা। লোভ, প্রলোভন, ক্ষমতার মোহ কিংবা আত্মসংযমের প্রশ্নে আমরা প্রতিদিনই সেই সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকি। পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামও আসলে এমনই এক আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন। যে সমাজ নিজের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে না, সে সমাজ প্রকৃতির ওপরও সংযমী হতে পারে না।
সমকাল আমাদের আরেকটি বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—তথ্যের বাজার। সেখানে সত্য অনেক সময় বিনোদনের কাছে পরাজিত হয়, গভীরতা হারিয়ে যায় চটকদারিত্বের ভিড়ে। অথচ পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হলে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। কারণ বিভ্রান্তি কখনও প্রকৃত পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে না।
মানুষের স্মৃতি, প্রেম এবং হারিয়ে যাওয়ার বেদনার সঙ্গেও প্রকৃতির সম্পর্ক চিরন্তন। ধানের মাঠ, পাখির বাসা, সমুদ্রের ঢেউ কিংবা দখিনা বাতাস—এসব কেবল উপমা নয়; এগুলি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক স্মারক। প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে তাই আমাদের সম্মিলিত স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা।
উন্নয়নের নামে গড়ে ওঠা কাঠামো, নগরায়ণ কিংবা পরিকল্পনাহীন নির্মাণ আজ নতুন প্রশ্ন তুলছে। দায় কার? কেবল সেই মানুষের, যে নিয়ম ভাঙে, নাকি সেই ব্যবস্থারও, যা আইন করে অনুমোদিত হয়?
তবু আশা হারানোর কারণ নেই। মানুষ বারবার নিজের অহংকারের ভার নামিয়ে রেখে নতুন করে পারাপারের স্বপ্ন দেখেছে। সম্পর্ক, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধের হাত ধরেই সে অন্ধকার সময় অতিক্রম করেছে। আজও সেই সম্ভাবনা রয়ে গেছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের মনে রাখা দরকার—পরিবেশ শুধু বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। প্রকৃতির প্রতি মমতা, মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা, সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভবিষ্যতের প্রতি দায়বদ্ধতা—এই চারটি স্তম্ভের উপরই টিকে থাকে একটি সুস্থ পরিবেশ।
পৃথিবীকে বাঁচানোর লড়াই তাই বাইরে যেমন, তেমনি ভেতরেও। বন রক্ষার পাশাপাশি আমাদের রক্ষা করতে হবে বিবেকের সজীবতাকেও।
সায়ন্তন ধর
0 Comments.