- 3
- 0
পিয়ানো
দ্বিতীয় অধ্যায়: যে বিকেলে সুর প্রথম পেল একটি মুখ
অর্ণব আজও মনে করতে পারে, সেই বিকেলের আলোটা অন্য সব দিনের আলোর থেকে আলাদা ছিল। মানুষের স্মৃতি বড় অদ্ভুত — জীবনের হাজারো দিন, হাজারো বিকেল, হাজারো মুখ একে অপরের ভেতর মিশে যায়, অথচ কোনো কোনো মুহূর্ত মনের গভীরে এমনভাবে বসে যায় যে বহু বছর পরেও তার রং ফিকে হয় না। বরং সময় যত এগোয়, স্মৃতির পথে সেই রং ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সেদিন শরতের শেষ দিক। আকাশে সাদা মেঘের ছোট ছোট পাল ভেসে বেড়াচ্ছিল, বাতাসে কাশফুলের গন্ধ, দূরে কোথাও শিউলি ঝরার নরম শব্দ। শহরের সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ জুড়ে উৎসবের এক উচ্ছ্বাস — প্রবেশপথে তরুণ-তরুণীদের ভিড়, কেউ শেষবার গলা সাধছে, কেউ কবিতার খাতা উল্টে দেখছে, কেউবা যন্ত্রের তার শেষ মুহূর্তে মিলিয়ে নিচ্ছে। এই ব্যস্ততার মধ্যেও অর্ণব ছিল নিজের স্বভাবমতো — সেদিনও একা। মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকেও সে সবসময় নিজের ভেতরের নীরবতাকেই শুনতে পেত বেশি।
অনুষ্ঠানে তার আসার কথাই ছিল না। নির্ধারিত পিয়ানোবাদক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ মুহূর্তে তাকে ডাকা হয়েছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে রাজি হয়ে গিয়েছিল — তখনও জানত না, জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলো কোনো পরিকল্পনা মেনে ঘটে না। তারা এসে দাঁড়ায় ঠিক তখনই, যখন মানুষ সবচেয়ে অপ্রস্তুত থাকে।
মঞ্চের পর্দা ধীরে ধীরে সরে গেল, আলো নিভে এলো। ঘোষকের কণ্ঠে ভেসে উঠল একটা নাম — "মেঘলা সেন।"
অর্ণব তখনও তার মুখ দেখেনি, শুধু শুনেছিল নামটা।
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানোর আগে মেয়েটি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। সেই নিঃশ্বাসে উৎকণ্ঠা ছিল না, ছিল না নিজেকে জাহির করার তাড়া। মনে হচ্ছিল যেন কেউ নিজের ভেতরের সব অস্থিরতাকে যত্ন করে গুছিয়ে নিয়ে, তবেই প্রথম শব্দটি উচ্চারণ করতে যাচ্ছে। অর্ণবের মনে সেই মুহূর্তেই একটা অদ্ভুত ধারণা জন্মাল — যে মানুষ গান গাওয়ার আগে নিজের নিঃশ্বাসের প্রতিও এত সচেতন, সে শব্দকে শুধু উচ্চারণ করে না, হৃদয় দিয়ে অনুভব করে।
মেয়েটি প্রথম কথা বলল — কয়েকটা সাধারণ সম্ভাষণ মাত্র। কিন্তু সেই কয়েকটি বাক্যেই বোঝা গেল, এই কণ্ঠস্বরে কোনো অভিনয় নেই। অনেক শিল্পী মঞ্চে উঠে নিজের উপস্থিতিটাকেই বড় করে তোলেন; এই কণ্ঠস্বর ঠিক তার উল্টো — এখানে অহংকার নেই, নিজেকে প্রমাণ করার তাড়া নেই। মনে হয়, সে গান গাইতে আসেনি, এসেছে হৃদয়ের একটা জানালা খুলে দিতে।
অর্ণব প্রথমবার মুখ তুলে তাকাল। সেই দৃষ্টির কথা সে পরে বহুবার মনে করার চেষ্টা করেছে — কী দেখেছিল সেদিন? সৌন্দর্য নয়। সুন্দর মুখের অভাব পৃথিবীতে নেই। কিন্তু কোনো কোনো মুখ থাকে যাদের দিকে তাকালে মনে হয়, তারা জীবনের সঙ্গে লড়াই করেনি, বরং জীবনকে ক্ষমা করতে শিখেছে। মেঘলার মুখে সেই ক্ষমারই একটা নরম আলো ছিল। তার দুটো চোখ স্বচ্ছ, জল নেই সেখানে, অথচ গভীরতা আছে — আর সেই গভীরতার মধ্যে একটা প্রশান্তিও, যেন সারারাত জেগে থাকা কেউ ভোরের প্রথম আলোয় হঠাৎ নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে।
অর্ণব টের পেল, এই মানুষটির কণ্ঠস্বর আর তার নিজের পিয়ানোর মধ্যে কোথাও যেন বহুদিনের চেনা এক আত্মীয়তা লুকিয়ে ছিল, যা সে নিজেও এতদিন জানত না।
গান শুরু হলো। প্রথম কয়েকটা নোট বাজানোর সঙ্গে সঙ্গেই অর্ণব বুঝল, আজ তার আঙুল অন্য দিনের মতো চলছে না। আজ সে নোটের হিসেব করছে না, মেঘলার কণ্ঠের শ্বাস-প্রশ্বাস অনুসরণ করছে। মেঘলা যেখানে একটা শব্দকে একটু টেনে নিচ্ছে, তার আঙুলও সেখানে নিজে থেকেই একটু থমকে যাচ্ছে। মেঘলা যেখানে নিঃশব্দে একটা বাক্য শেষ করছে, পিয়ানোর সুরও সেখানে অকারণে আরও কোমল হয়ে উঠছে।
মঞ্চে তখন দুটো আলাদা শিল্পী ছিল না — ছিল একটাই সংগীত।
গান শেষ হলে অডিটোরিয়ামে কয়েক মুহূর্তের জন্য এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। করতালি আসতে একটু দেরি হলো, আর অর্ণব সেই নীরবতাকেই মনে করল জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশংসা। কারণ মানুষ যখন সত্যিই স্পর্শিত হয়, তখনই সে সঙ্গে সঙ্গে হাততালি দিতে পারে না — অনুভূতির নিজের একটা ভাষা খুঁজে নিতে হয়, আর তাতে সময় লাগে কয়েকটা মুহূর্ত।
সেদিনও তাই হয়েছিল। কেউ কিছু বলছিল না, কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই যেন শত শত অদৃশ্য বাক্য ভেসে বেড়াচ্ছিল।
অর্ণব তখনও জানত না — একটা গান শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার জীবনের দীর্ঘতম গল্পটা তখন সবে শুরু হলো।
0 Comments.