Tue 25 August 2026
Cluster Coding Blog

গদ্যের পোডিয়ামে (ধারাবাহিক) সুবীর সরকার

maro news
গদ্যের পোডিয়ামে (ধারাবাহিক) সুবীর সরকার

সুপুরি বনের ছায়ায় ছায়ায়

দ্বিতীয় পর্ব


দেবজ্যোতি রায়ের সঙ্গে কিভাবে পরিচয় হয়েছিল আজ আর মনে নেই।কবি,প্রাবন্ধিক,গদ্যকার,নকশালবাড়ি আন্দোলনের একদা সক্রিয় কর্মী দেবজ্যোতি রায় তখন রাজনীতি থেকে সরে এসেছেন।পুরোপুরি নিমগ্ন রয়েছেন লেখা পড়ায়।দেবজ্যোতি রায় ক্রমে আমার প্রিয় বাবু দা হয়ে উঠলেন।সদ্য লিখতে আসা এক তরুণের পিঠে ভালোবাসার হাত রাখলেন।আমি তখন রোগা প্রেমিকের মত সারা শহরে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াই।প্রতি মুহূর্তে স্বপ্ন দেখি।রাতের পর রাত জেগে কাটাই।মেদো মাতালদের সঙ্গে ভাটিখানায় আড্ডা জমাই।ওদের জীবনের গল্প শুনি।আর রাত জেগে লেখা চিঠিগুলো ভোরের ডাকবাক্সে ঢুকিয়ে দিই।


সপ্তাহে চারদিন বাবু দার পাটাকুড়ার বাড়িতে যাই।


এক জোড়া জিজ্ঞাসু ও বুদ্ধিদীপ্ত চোখ মেলে বাবু দা আমাকে পরখ করেন।টেবিল জুড়ে অগণন বই।লেখার খাতা।সিগারেটের প্যাকেট।আমি লেখা আর জীবন নিয়ে সবসময় জানতে চাই।বাবু দা তার মতন করে কত কথাই যে বলে চলেন।


একটা দীর্ঘ গদ্য লিখছিলেন।তার অংশ বিশেষ বাবু দা পড়ে শোনান।তোর্সা নদীতে স্নান করতে গিয়ে চোরাবালুতে ডুবতে থাকবার গল্প থেকে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নানান কথা জানতে পারি।


অনেক পরে সেই সব লেখা বই আকারে বেরোয়।


"নরকের থেকে একটুকরো অনির্বচনীয় মেঘ"_এই শিরোনামে।দুবছর আগে যার নুতন মুদ্রণ প্রকাশ পেয়েছে।


বাবু দা কবিতা শোনান।জীবনের অন্ধকার এক পাতালে প্রবেশ করি।বেঁচে থাকবার লড়াই করা মানুষের আস্ত এক অভিশপ্ত জীবন সেই সব লেখা জুড়ে।দেবজ্যোতি রায় আমাকে শোনান বিশ্ব সাহিত্যের গল্প।ইউরোপ,ল্যাটিন আমেরিকার,আফ্রিকার সাহিত্য।লোকজীবনের কথা।


আমি শিখি।প্রতি মুহূর্তে শিখি।মাঝে মাঝে বাবু দার স্কুটারে চেপে চলে যাই ঘুঘুমারি।কবি অরুনেশ ঘোষের বাড়ি।


এভাবেই আমার জীবনবোধ,আমার স্বপ্নকে উস্কে দিয়েছিলেন বাবু দা।


এখনও বাবু দার সাথে আড্ডা হয়।নুতন ভাবনা,নুতন লেখা শোনা ও শোনানো হয়।


আমার কবিতা জীবনে,আমার লেখা পড়ার জীবনে দেবজ্যোতি রায় একটা সুতীব্র বাতিস্তম্ভ হয়েই থাকবেন।


কবি কমলেশ রাহা রায়।আলিপুরদুয়ার শহরে থাকতেন।পত্রিকা করতেন।কবিতার সভায় ঘুরে বেড়াতেন।নুতন স্বর আবিষ্কারের নেশা ছিল কমলেশ দার।স্বতন্ত্র এক ঘরানায় কবিতা পাঠ করতেন।সেই পাঠ খুব ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেত।তরুণ লেখকদের জন্য এক বুক ভালোবাসা বহন করতেন কমলেশ দা।এমন আড্ডাবাজ আর স্বপ্ন দেখানো অগ্রজ এই সময়ে খুব বিরল হয়ে আসছে।আমার শুরুর দিনগুলিতে কমলেশ দার স্নেহের স্পর্শ,সান্নিধ্য আমাকে অনেকটাই গড়েপিটে দিয়েছিল।আজ,এত এত বছরের দূরত্বে দাড়িয়ে খুব অনুভব করি সেটা।আমি প্রতি মাসে ৩/৪ বার চলে যেতাম কমলেশ দার কাছে।আলিপুরদুয়ার হাসপাতাল কোয়ার্টারে কমলেশ দার তৎকালীন বসবাস।আজকের তরুণ কবি কমলেশ দার ছেলে অরুণাভ রাহা রায় তখন খুব ছোট।কবি কমলেশ রাহা রায়ের সঙ্গে আড্ডা মানে প্রচুর রসদ পেয়ে যাওয়া।কবিতার পর কবিতা পড়ে যেতেন।শুধু নিজের নয়।উত্তরের কবিদের কবিতা পড়তেন।তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতেন।বাংলার অনেক লিটিল ম্যাগাজিনের সাথে পরিচয় গড়ে উঠেছিল কমলেশ দার সূত্রেই।


আমার কবিতা মন দিয়ে শুনতেন।কখনো দুই তিনবার করে পাঠ করতে বলতেন।নিজে দেখে দিতেন আমার কবিতার খাতা।মাঝে মাঝে কবিতা পাঠের আসরে আমাকে সঙ্গী করতেন।কত নুতন মানুষের সাথে পরিচয় হত।


কমলেশ রাহা রায়ের সূত্রেই পরিচয় এবং তার পর নৈকট্য গড়ে উঠেছিল কবি সমীর চক্রবর্তী,কবি তনুময় সরকার,কবি দীলিপ বিশ্বাস,কবি শিপ্রা সেন ধর,কবি সনৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।


এরপর তো তনুময় সরকার আর "চারুমুদ্রণ" আমার জীবনে এক ঝলক তেজি বাতাসের মতন হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো।


কবি কমলেশ রাহা রায় আজ ব্যাধি আক্রান্ত।কিন্তু এখনও দেখা করতে গেলেই সেই সুতীব্র আবেগময় খুশিয়াল উৎসাহী চোখ আমাকে তুমুল স্পর্শ করে।


এমন অগ্রজের সান্নিধ্য আর স্নেহ অর্জন যে কোন তরুণের কাছে অনবদ্য প্রাপ্তি।


খুব লিখলেন না পরের দিকে আর কমলেশ দা।


আমি ওনাকে বলেছি নিজের কবিতা জীবনের কথা লিখতে, যা পরের প্রজন্মের কাছে সম্পদ হয়ে উঠবে।


এখনও মাঝে মাঝে কবি কমলেশ রাহা রায়ের "বিপরীত বসন্ত" বইটি আমাকে পড়তে হয়।


আর আমি স্পষ্ট দেখতে পাই ঝকঝকে দুই চোখে জীবনের আলো মেখে কবিতা পড়ছেন বাতাসে আঙুলের আঁচড় কাটতে কাটতে আমাদের কমলেশ। দা।


এই সব মিলিয়েই তো আমাদের বাংলা কবিতা।

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register