- 4
- 0
শব্দের ভেতরে সময়ের মুখ
সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয়; সাহিত্য সময়ের স্পন্দন, সমাজের আত্মকথা এবং মানুষের অন্তর্লোকের প্রতিধ্বনি। টেক টাচ টক সাহিত্য জোনের এই সপ্তাহের সংখ্যায় সংকলিত রচনাগুলি সেই বহুমাত্রিক মানবজীবনেরই নানা রূপকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে।
এই সংখ্যার সূচনা হয়েছে প্রকৃতি ও পরিবেশের গভীর সংকটকে কেন্দ্র করে। তপন মণ্ডলের ‘সংকটে অস্তিত্ব’ কবিতায় সুন্দরবন, ম্যানগ্রোভ এবং মানবসভ্যতার অদূরদর্শী উন্নয়নচিন্তার সংঘাত এক তীব্র প্রতিবাদী উচ্চারণে ধরা দিয়েছে। প্রকৃতির ক্ষত যে শেষ পর্যন্ত মানুষেরই ক্ষতি, সেই সতর্কবার্তা কবিতাটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
অন্যদিকে রত্না দাসের অণুগল্প ‘ছুরির ধার’ আমাদের নিয়ে যায় এক শিশুমনের অন্ধকার ও ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতায়। সমাজের নানাবিধ অবক্ষয়, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন বিকৃতি এবং নিষ্পাপ অনুভূতির দ্বন্দ্ব গল্পটিকে শুধু একটি আখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে এক সামাজিক দলিল।
বর্তমান সময়ে অম্বুবাচী উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতীমরাজ ভট্টাচার্যের প্রবন্ধ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ‘অম্বুবাচী: মাতৃশক্তির মহামিলন ও কামাখ্যার নান্দনিক মহিমা’ প্রবন্ধে ধর্ম, প্রকৃতি, নারীত্ব ও আধ্যাত্মিকতার এক সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে। উৎসবের বাহ্যিক আচারকে অতিক্রম করে এর অন্তর্নিহিত দর্শনকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে লেখক আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখান।
নবকুমার মাইতির ‘মুক্তি কামনায় শব সাধনা’ কবিতায় আত্মসংঘাত, সংসার ও পরমার্থের টানাপোড়েন এক দার্শনিক বয়ানে প্রকাশিত হয়েছে। একইভাবে শুভাশিস সাহুর ‘ভালবাসা তবু আজ ব্যর্থতার পরিহাস’ কবিতায় প্রেম ও বেদনাবোধের চিরন্তন মানবিক অনুভূতি মূর্ত হয়েছে সংযত ভাষায়।
চিরঞ্জীব হালদারের ‘একটি অরাজনৈতিক মন্ত্র’ ব্যঙ্গ ও রসের মোড়কে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। আর অন্নপূর্ণা দাসের ‘কিছুটা সময়’ কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভব, ভরসা, সম্পর্ক এবং না-বলা কথার মৃদু আবেগ এক অন্তরঙ্গ আবহ তৈরি করেছে।
এই সংখ্যার শেষপ্রান্তে ডরোথী দাশ বিশ্বাসের ‘হে নীলাচল—’ কবিতা যেন অম্বুবাচীর আবহকে আরেকবার নতুন আলোয় ফিরিয়ে আনে। প্রকৃতি, স্মৃতি, দূরত্ব ও আধ্যাত্মিক অনুভবের মিশেলে কবিতাটি পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করে।
এই সংখ্যার প্রতিটি রচনা ভিন্ন ভিন্ন স্বর ও অভিজ্ঞতা বহন করলেও তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতুবন্ধন রয়েছে—মানুষকে, প্রকৃতিকে, বিশ্বাসকে এবং আত্মঅন্বেষণকে নতুন করে দেখার আহ্বান। সাহিত্য যখন কেবল বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে প্রশ্ন তোলে, ভাবায় এবং অনুভবের গভীরে পৌঁছে যায়, তখনই তার সার্থকতা।
সকল লেখক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আগামী দিনেও টেক টাচ টক সাহিত্য জোন হয়ে উঠুক সৃজনশীল চিন্তা, মানবিক বোধ এবং মুক্ত সাহিত্যচর্চার এক প্রাণবন্ত মিলনক্ষেত্র।
0 Comments.