Sat 15 August 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় অংশুদেব

maro news
হৈচৈ তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় অংশুদেব

ছড়ার আগে পরে ছড়ার ভাবনা 

 মানুষের কন্ঠে সাত সুরের সাধনা শুরু হয় সাত স্বরের রেওয়াজের মাধ্যমে। আমরা যারা কথা বলতে পারি তারা শৈশবের সাত আট মাস বয়স থেকে -অ-,-আ-,-ই-,-উ-,-ঋ-,-এ-,-ও- স্বরের সাধনা সেরে স্বরযন্ত্রের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংবেদন অনুভূতি কেন্দ্রও সচল করে তুলি। শৈশব থেকে অর্জিত অনুভূতি ও অনুরূপ শব্দ বোধ গড়ে উঠতে থাকে মস্তিষ্কে । গলার স্বরযন্ত্রের কম্পন এবং শ্রুতি যন্ত্রের কম্পনের মাত্রা আমাদের একাধিক আবেগ বোধ তৈরি করে। কথা বলার ধরনের ওপর মানুষের রাগ, দুঃখ, কামনা, আনন্দ ইত্যাদি আবেগ সৃষ্টি হয় । তাই মনুষ্য সভ্যতায় অচেতন ভাবেই গলার স্বরের বা কথা বলার বিভিন্ন তরঙ্গ মাত্রা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে গেছে। দৈনন্দিন জীবনেও আমরা এর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকি। এই কথা বলা শুধু ভাব প্রকাশ নয়, তা আবেগ উৎপাদনের উৎস - এ উপলব্ধি থেকেই হয়তো গান ,নাটক, যাত্রা, আবৃত্তি, কবিতা পাঠ, গল্প পাঠ,ছড়া পাঠ বিভিন্ন শ্রুতি নির্ভর শিল্পের আবির্ভাব ঘটেছে।

      মুখনিঃসৃত ধ্বনি-তরঙ্গ শ্রুতি শিল্পের মূল উপাদান। ধ্বনির সমন্বয়ে কেবল শব্দ তৈরি হয় না, শব্দের মধ্যে সুর বা সংগীত তৈরি হয় । তারপর শব্দ মালায় যুক্ত হয় লয় , তারপরে তাল। এই ধ্বনি থেকে বাক্যের যাত্রা পথে কন্ঠ, কর্ণ, মস্তিষ্ক একই গ্রন্থিতে বাঁধা পড়ে যায় ।ধ্বণি, তাল ও লয় মিলে যে সুর সৃষ্টি হয় তার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আমাদের বোধ , ব্যক্তিত্ব , চিন্তা ও আনন্দ জগত।সুর সাধারণত তিন প্রকার ,সুসুর, অভ্যস্ত সুর, আর কুসুর । কন্ঠ বা যন্ত্র যেখান থেকে শব্দ তরঙ্গ বা ধ্বনি তরঙ্গ উৎপন্ন হোক না কেন , যা শ্রুতি মধুর হলে সুসুর বা ছন্দ বলা যায়, এছাড়া ধ্বনি তরঙ্গ বা শব্দ তরঙ্গ যদি শ্রুতি সহনশীল হয় এবং বিরক্তিকর না হয় ,যা অভ্যস্ত সুর ।আর বিরক্তিকর হলেই তা কুসুর।

       নিজের কন্ঠ উৎপাদিত সুর বা বাইরে থেকে আসা সুর ,যা মস্তিষ্কের কোনো একক অংশে নয়, বরং পুরো মস্তিষ্কজুড়ে একটি ছন্দময় সমন্বয় তৈরি করে । মস্তিষ্কের অডিটরি কর্টেক্স (Auditory Cortex) শব্দ ও সুরের কম্পন গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করে।লিম্বিক সিস্টেম (Limbic System & Amygdala) সুরের সাথে আবেগ ও অনুভূতির সংযোগ ঘটায়।হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus) স্মৃতির সাথে সুরের সংযোগ তৈরি করে। প্রিয় কোনো সুর পুরনো কোনো সুন্দর স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলে মন ভালো করে দেয়।মোটর কর্টেক্স (Motor Cortex) তাল ও ছন্দের সাথে সাথে অজান্তেই পা দোলানো বা হাত নাড়ানোর উদ্দীপনা তৈরি করে।পছন্দের শান্ত ও মিষ্টি সুর শুনলে মস্তিষ্কে আলফা ওয়েভ (Alpha waves) বৃদ্ধি পায়। আলফা তরঙ্গ মস্তিষ্ককে শান্ত, কিন্তু সজাগ ও সৃজনশীল অবস্থায় নিয়ে যায়, যা মেডিটেশন বা ধ্যানের কাছাকাছি একটি আনন্দের অনুভূতি দেয়।

         সুর শোনার সময় মস্তিষ্কের নিউক্লিয়াস একুমবেন্স (Nucleus Accumbens) এবং ভেনট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া (VTA) সক্রিয় হয়ে ওঠে। এগুলো মস্তিষ্কের "রিওয়ার্ড সিস্টেম" বা পুরস্কার অনুভূতি চক্রের অংশ। প্রিয় কোনো সুরের সুরমুর্ছনা বা ক্লাইম্যাক্স আসার ঠিক আগের মুহূর্তে এবং সেই মুহূর্তে মস্তিষ্ক ডোপামিন (Dopamine) নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে, যা আমাদের আনন্দ, রোমাঞ্চ ও তৃপ্তি দেয়।গান শুনলে অ্যাড্রেনাল গ্ল্যান্ড থেকে নিঃসৃত স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল (Cortisol)-এর মাত্রা দ্রুত কমে যায়। ফলে রক্তচাপ ও হূদস্পন্দন স্বাভাবিক হয় এবং শরীর ও মন শিথিল (relax) হয়ে আসে।

       সুর আমাদের মনকে কল্পিত এক আনন্দ জগতে নিয়ে যায় , তেমনি অভ্যস্ত না হলে বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। ছড়া, আবৃত্তি, পাঠ ,নাটক ইত্যাদি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠিক গানের আগে থাকে । ​নৃবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ কথা বলতে শেখার আগেই সুর বা গুঞ্জন (Humming) দিয়ে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে শিখেছিল। ছড়া হলো সেই আদিম সুর এবং আধুনিক ভাষার মধ্যবর্তী একটি সেতু। ভাষা ও সংগীত সম্ভবত একে অপরের হাত ধরেই বিকশিত হয়েছে, যাকে অনেক সময় 'Musilanguage' বলা হয়।

         অন্তমিলের ভাষায় ভাব অনুসারে সুরকার সুর বসান ,তা গানে পরিণত হয়। প্রত্যেক সংগীতে বিশেষ রীতির ধ্বণি তরঙ্গ থাকে,যা আমাদের মস্তিষ্কে আনন্দ উৎপাদন কারী হরমোন নিঃসরণ করে। ছড়ার ক্ষেত্রে 'অন্তমিল' (Rhyme) এবং 'ছন্দ' (Rhythm) এক ধরণের Predictability বা প্রত্যাশা তৈরি করে। যখন একটি পঙক্তির শেষে প্রত্যাশিত মিলটি খুঁজে পাওয়া যায়, মস্তিষ্ক তখন একটি "Reward" অনুভব করে, যা থেকে আনন্দ উৎপন্ন হয়।

         ছড়ার ব্যাপ্তি বেশি নয়। তবে ধ্বনি স্রোত নির্দিষ্ট লয় ও তালে অনুরণিত হলে তার ভাববস্তু আমাদের বোধের রাজ্য থেকে প্রজ্ঞায় মিশে অনির্বচনীয় আনন্দ উৎপাদন করে। ছড়ায় ছন্দ এবং তাল অত্যন্ত আবশ্যক এক ঘনিষ্ঠ উপাদান।ছন্দ হলো প্রবাহের গতি ও শ্রুতি সৌন্দর্য , আর তাল হলো সেই প্রবাহকে মেপে রাখার নির্দিষ্ট পরিমাপক বা কাঠামো। মোটকথা ছন্দ হলো সুরের প্রাণ ও গতি, আর তাল হলো তার কাঠামো ও শৃঙ্খলা। সংগীতের মতো ছড়াতেও একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক বিন্যাস থাকে। ছড়ার সংক্ষিপ্ত ব্যাপ্তি তাকে প্রখর এবং প্রভাবশালী করে তোলে।সংগীত আমাদের অজানার রাজ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আর ছড়া চেনা শব্দ দিয়ে অচেনা এক অনুভূতির জন্ম দেয়। ছড়ার এই সংহতি বা 'Compactness' আমাদের চিন্তাশক্তিকে দ্রুত সংকুচিত করে একটি গভীর উপলব্ধিতে (Insight) পৌঁছে দেয়, যাকে 'প্রজ্ঞা' বলা হয়েছে।উভয়ক্ষেত্রেই বোধ আলোড়িত হয় , তফাৎ সুর আর কথায় । ​ছড়া ও সংগীতের তুলনা করলে দেখা যায় -

        ছড়া (Rhyme/Verse): মাধ্যম প্রধানত শব্দের সুর ও ছন্দ,মস্তিষ্কের প্রভাব - ভাষাগত ও ছন্দবদ্ধ আনন্দ,ব্যাপ্তি -নির্দিষ্ট ও অর্থবহ,মিল-অন্তমিল এবং লয়।

         সংগীত (Music) :মাধ্যম প্রধানত সুর ও লয়,মস্তিষ্কের প্রভাব- সংবেদনশীল ও কম্পনজনিত আনন্দ ,ব্যাপ্তি -অসীম ও বিমূর্ত,মিল -স্বরলিপি এবং তালের সামঞ্জস্য ।

        ছড়াকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করতে বিভিন্ন ছড়াকার বিভিন্ন কৃৎকৌশল ব্যবহার করেছেন। প্রাচীন বাংলা ভাষার ছড়া বা ছেলে ভুলানো ছড়ার ক্ষেত্রে মাত্রা অপেক্ষা তাল এবং লয় গুরুত্ব লাভ করেছে। "জাতিস্মর " ও " অ্যান্টোনি ফিরিঙ্গি" এই দুই সিনেমায় যে কবির লড়াই দেখা যায়, সেখানে প্রত্যেক গায়েন ঢোলক ও কাঁসার তালে তালে অন্তমিলে কথা মিলিয়ে গান গেয়ে বিষয় উপস্থাপন করছেন। এই কবিয়াল ধারার উত্তরসূরী মনে হয় কিছু বাংলা ব্যাণ্ড ( রক বা ওয়েস্টার্ন ছাড়া । রক ও ওয়েস্টার্ন-এর ওপর অন্তমিল যুক্ত কথাও বসানো হয় ,যা আপাত খাপছাড়া মনে হয়) । তাই ছড়ার ক্ষেত্রে ঢোল বা ঢোলক বা খমকের তালটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। এর সঙ্গে দল মাত্রা হিসাবে মাঝে মাঝে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। 

         ছড়ার ছন্দ মানেই দলবৃত্ত বা স্বরবৃত্ত, যেখানে চলন ৪+৪+৪+৪ হয়ে থাকে। কখনো কখনো পর্ব ৩ ও ৫ মাত্রা হতে দেখা যায়। এই নিয়ে তর্ক ওঠে। যদি আমরা ঢোলকের তাল মাপি তা হলে ৩,৪,৫ এর বিবাদ থাকে না। ঢোলকের একটা নির্দিষ্ট আবর্তনের (Cycle) মধ্যে লয় ঠিক থাকলে মাত্রা সংখ্যা কম-বেশি হলেও তালের ভারসাম্য নষ্ট হয় না। যেটাকে সংগীতে 'আড়ি' বা 'কুয়াড়ি' লয় বলা হয়। ছড়াতেও ঠিক তাই; পড়ার ঢং বা লয়ের জোরে ৩ বা ৫ মাত্রার পর্বকেও ৪ মাত্রার স্পেসের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া যায়। একেই আমরা শ্বাসাঘাতের জোর বলি। দলবৃত্ত রীতিতেও মুক্তদল প্রসারিত হতে পারে, আবার মাত্রা শোষণ ও ঘটতে পারে, অর্থাৎ ২ মাত্রা ৩ মাত্রায় পরিণত হতে পারে আবার ৫ মাত্রা ৪ মাত্রায় পরিণত হতে পারে।

     এক হাত/ এক তাল

        দুই হলে হবে না 

     তিন তাল/তিন দিক

        পিছন তো দৃশ্য না।

   এখানে " এক" ,"হাত" ও " তাল " দলবৃত্ত রীতিতে এক মাত্রা হবার কথা , কিন্তু ঝোঁক বা শ্বাসাঘাত বা তাল রক্ষার কারণে দুই মাত্রা হয়ে যাচ্ছে। 

         সাধারণত ছড়া পাঠ শুরু হয় প্রবল ঝোঁক বা শ্বাসাঘাত বা এ্যাক্সেন্টে । কিন্তু পঙ্কতির শেষ দিকে সেই ঝোঁক তত প্রবল থাকে না, কিছুটা কমে আসে। তখন দলের ধ্বনি প্রসারণ ঘটে,তাল রক্ষা করে। তাই শেষ পর্বে মুক্তদল প্রসারিত হয়ে যায় দু'মাত্রায় ।আসলে মাত্রাবৃত্তের দুই মাত্রার সময় দলবৃত্তের শেষ পর্বের একমাত্রার সময় প্রায় এক। যেমন— "খোকা যাবে মাছ ধরতে / ক্ষীর নদীর কূলে"। এখানে 'কূলে' শব্দটি উচ্চারণ করতে যে সময় লাগে, তা আগের পূর্ণ পর্বগুলোর সমান গুরুত্ব পায়। মাত্রাবৃত্তের ২ মাত্রা আর দলবৃত্তের ১ মাত্রা এখানে সময়ের হিসেবে তালে সমান হয়ে যাচ্ছে । তাই শেষ পর্বে রুদ্ধদল বসিয়ে বা না বসিয়ে দুটো মুক্তদলে ৫ মাত্রা হলেও তাল রক্ষিত হয়। ​শেষ পর্বে রুদ্ধদল (Closed syllable) বসিয়ে ছন্দকে আটসাট করা যায়, আবার না বসিয়ে মুক্তদলকে টেনে দিলেও তালের পতন ঘটে না। এর কারণ হলো দলবৃত্ত ছন্দের 'স্থিতিস্থাপকতা'। 

        সম তাল,সম লয়, সমধ্বনি ( একক ধ্বনি বা গুচ্ছ ধ্বনি) মিল যাত্রা ছড়ার আরও একটা লক্ষনীয় দিক । আমরা বেশিরভাগ ছড়াকারদের দেখি চরণ বা পঙক্তি শেষের মিলের দিকে নজর রাখেন। একজন ছড়াকার যিনি ধ্বনি শিল্পী তিনি শুধু চরণান্ত মিলের দিকে লক্ষ রাখবেন না,পর্বান্ত মিল এমনকি পর্বাঙ্গ মিলের দিকেও যত্নবান হবেন। চরণের শেষে মিল কিছুটা রৈখিক (Linear) করে তোলে। যখন পর্বান্ত মিল বা অনুপ্রাসের কথা ভাবা হয়, তখন ছড়াটি রৈখিক না হয়ে ত্রিমাত্রিক হয়ে ওঠে।উদাহরণ: "খোকন খোকন ডাক পাড়ি / খোকন মোদের কার বাড়ি?"—এখানে শুধু শেষে মিলটা রৈখিক।

 ত্রৈমাত্রিক উদাহরণ : 

​"বাইন বায় / ঢালায় ছায়,

ঘোঙার ঝোপে / বকের রুপে।

চোখ বুজে আস / নাও-মাঝি মাস,

পদ্মে ভোমরা / জিমছে গমরা।

কূলের গাছ / ভাসায় মাছ,

নদীর পাঁক / ছড়ায় ঝাঁক।"

      সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে বাংলা সাহিত্যের "ছন্দের জাদুকর" বলা হয় কারণ তিনি চরণের শেষ মিলের চেয়ে পর্বাঙ্গের ধ্বনি-ঝঙ্কারকে বেশি প্রাধান্য দিতেন।কেন এটি ত্রিমাত্রিক? প্রতিটি চরণ দুটি করে পর্বে বিভক্ত। এখানে লক্ষ করার মত বিষয়, চরণের শেষের মিলের আগেই প্রতিটি পর্বের নিজের ভেতরের শব্দগুলো কীভাবে পরস্পরের সাথে মিলে গেছে—বায়/ছায়, ঝোপে/রুপে, আস/মাস, ভোমরা/গমরা, গাছ/মাছ, পাঁক/ঝাঁক।পাঠক যখন এটি পড়েন, তখন কান কেবল চরণের শেষে গিয়ে থামে না; প্রতিটি পর্বের ভেতরেই একটি আবর্ত তৈরি হয়। মাঝির দাঁড় টানার ছন্দের সাথে সাথে শব্দগুলো যেন জলের ঢেউয়ের মতো উপর-নিচে ও সামনে-পিছনে দুলতে থাকে। এটিই রৈখিকতা ভেঙে ত্রিমাত্রিক ধ্বনি-বলয় তৈরি করেছে।

        খ্যাতনামা বিশিষ্ট ছড়াকাররা এদিকটা এড়িয়ে গেছেন তা নয়। তবে ছড়ার সঙ্গে লোকজ উপাদান থাকায় সর্বাঙ্গ মিল বা অনুপ্রাসের দিকে নজর রাখা সম্ভব হয় না। প্রয়াত ছড়াকার প্রদীপ মুখোপাধ্যায় বার বার লোকজ শব্দের কথা বলতেন। উদ্ভট,গ্রাম্য, ব্যাকরণ বহির্ভূত টোন বা শব্দ এনে চমক সৃষ্টি করতে হবে। লোকজ সব শব্দের মানে হয় না। ভাষার ভাবে বুঝে নিতে হয়। ​ব্যাকরণ বহির্ভূত শব্দ বা 'উদ্ভট' ধ্বনি অনেক সময় মনের গহীনে থাকা কোনো আদিম স্মৃতি বা অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে।এখানে পর্বাঙ্গ বা পর্বান্ত মিলে বা অনুপ্রাসে বোধহয় লোকজ শব্দ বা টোন ব্যবহার করে, ছড়াকে উন্নত শিল্পমাত্রায় নিয়ে যাওয়া যায় । ​লোকজ উপাদানে যে 'Raw Energy' বা কাঁচা তেজ থাকে, তা কৃত্রিম মার্জিত ভাষায় পাওয়া কঠিন। এই তেজ ব্যবহার করেই ছড়াকে 'এলিট' ঘরানা থেকে বের করে সাধারণ মানুষের প্রাণের স্পন্দন বানানো সম্ভব। অনুপ্রাস এবং লোকজ শব্দের সঠিক মিশ্রণ ছড়াকে উচ্চতর শিল্পমাত্রায় নিয়ে যায়। যখন পর্বাঙ্গ মিলে লোকজ ধ্বনি ব্যবহৃত হয়, তখন ছড়াটি আর কেবল পাঠ্য থাকে না, তা একটি 'ধ্বনি-চিত্র' (Sound-scape) হয়ে ওঠে।

উদাহরণ: 

১/

নদী কুলকুল্‌ চলে ব্যাকুলিয়া দিক্‌,

গাছপালা সব ঝাঁকঝাঁকিয়ে ধরেছে দিক্‌-বিদিক্‌।

পড়্‌ প টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে জল,

পাড়ার যত ছেলেমেয়ে করতেছে কলবল।"

         ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ' বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ')

     ২/

"উড়ুক উড়ুক পাতা, ঝড়ুক ঝরুক ডাল,

হাওয়ার হাঁকে চালের ছাউনি ছটফট করে আজকাল।

বাঁশবাগানের শিরশিরানি, মরমর পাতা—

মাটির ঘরে ঘুম ভেঙে যায়, মনটি উদাস হাঁতা।"

                 (জীবনানন্দ দাশের 'মাটি-পৃথিবীর টানে' )

         ছড়া যত উন্নত শিল্পই হোক না কেন, তার প্রাণভোমরা হলো 'মজা'। কারুকার্য করতে গিয়ে যেন রসদটি হারিয়ে না যায়। ছন্দ বা অলংকারের ভারে ছড়া যদি গুরুগম্ভীর হয়ে পড়ে, তবে তা তার নিজস্ব ধর্ম হারাবে। লোকজ শব্দের অদ্ভুতুড়ে ব্যবহারই মূলত এই মজাটাকে ধরে রাখে।

৫ আগষ্ট ২০২৬

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register