- 5
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
আবার কার কল এল? পড়ুন পরের ২০তম পর্বে…
বিট্টু বাড়িতে নেই, বাবার মন, তাই কমল ভীষণ চিন্তিত। পুলিশের কাছে সবকিছু জানিয়েছে। কে একজন ফোন করে কমলের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবী করেছে। পুলিশ সে ফোন নাম্বার ট্রেস করতে পারেনি। বিট্টুর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াতে রত্নার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। তবুও, সে ক্রমাগত কমলের কাছে মিথ্যে কান্নার অভিনয় করছে। কমল রত্নার আচরণে সন্দেহ প্রকাশ করলেও কিছুই বলতে পারে না। প্রথম পক্ষের স্ত্রী, তন্দ্রার বাবা-মা, রত্না সম্পর্কে কমলকে জানিয়েছে। সে কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না, বিট্টুর নিখোঁজ হওয়ার পর তন্দ্রাকে ভীষণরকম অনুভব করছে। তন্দ্রার ছবির কাছে গিয়ে কমল আফশোস করে। যা দেখে রত্না সহ্য করতে পারেনা। এমন সময় ল্যান্ডফোনে আরেকটি কল আসে। কমল রিসিভার তুলেই,
“হ্যালো”
“ভাইপো, আমি হরিকাকু বলছি। বিট্টুর কোনও খোঁজ পেলে?”
“না, কাকাবাবু। বিট্টুর কোনো খবর নেই। আজ দু’দিন হয়ে গেল সে বাড়িছাড়া। কোথায় আছে? কি করছে? কিছুই জানিনা। খুবই চিন্তা হচ্ছে”
“তুমি চিন্তা করো না বাবা। বিট্টুর কিছু হবে না”
কমল তার হরিকাকাকে বলল,
“আপনাকে আমি মোবাইলে কল ব্যাক করছি। ল্যান্ডফোনটা রাখছি”
হরিকাকার সাথে ব্যক্তিগত কথা বলার জন্য কমল একটু বাইরের দিকে যাবে বলে মনস্থির করল। রত্না সাথে সাথেই বলল,
“কি হল? ল্যান্ডফোনটা কেটে দিলে কেন? আমার সামনে কথা বলতে তোমার অসুবিধা হচ্ছে?”
“ঠিক তা নয়, ল্যান্ডফোনে কিডন্যাপারের কল আসতে পারে। তাই মোবাইলে কল করছি”
“ঠিক আছে, যা কথা বলার আমার সামনেই বলো”
“কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে। তাই একটু বাইরে যাচ্ছি। তুমি রান্নাঘর দেখো, রান্নার মাসি কি রান্না করছে? আমি আসছি”
কমল বেরিয়ে গেল। মোবাইলে তার হরিকাকুকে কল করার আগে সে বারবার দেখে নিল রত্না তাকে অনুসরণ করছে কিনা। সত্যিই রত্না কমলকে অনুসরণ করছে। কমল যথারীতি বিরক্ত প্রকাশ করল,
“কি হল? আমাকে ফলো করছ কেন? আমি হরিকাকার সাথে কথা বলেই আসছি”
রত্না গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে চাইল। কিন্তু কমলের কড়া চাহনিতে সে বেশ আড়ষ্ট হয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
“হ্যালো কাকু, আমি কমল বলছি”
“হ্যাঁ, কমল বলো”
“বলছি, আপনি বিট্টুকে মাসখানেক সঙ্গ দিয়েছেন। কাকাবাবু, সত্যি বলছি আমি বাবা হিসাবে ব্যর্থ। তন্দ্রা চলে যাওয়ার পর আমি বিট্টুকে সেভাবে সাথ দিইনি। আমার সাথে ওর দূরত্ব ক্রমশই বেড়েছিল। রত্নাকে বিয়ে করার পর এই দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে”
হরিবাবু কমলকে থামিয়ে বললেন,
‘অমনভাবে বলো না বাবা, আমি জানি তোমার মনের উপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে চলেছে। পরিবারের তিন প্রিয় মানুষ চলে গেল। বিট্টুকে মানুষ করার ভাবনা নিয়েই তুমি দ্বিতীয় বিবাহ করেছ। অন্যায় কিছু করোনি। আবার তোমার নিজস্ব বিজনেস আছে। সেখানে অনেক ঝক্কি সামলাতে হয়, সব জানি। তোমার ব্যস্তার সুযোগ নিয়েই বাড়িতে অনেককিছু ঘটে গেছে”
কমল বিট্টু সম্পর্কে হরিকাকাকে বলল,
“তবে বিট্টু আপনাকে ভীষণ ভালোবাসে। এক মাস ওর সাথে থেকেছেন। ঐ কদিন থেকে ছোট্ট ছেলেটাকে আপনি সেভাবে সাপোর্ট দিয়েছেন, আমি যারপরনাই কৃতজ্ঞ কাকাবাবু। আমার বিশ্বাস, আপনার থাকাকালীন বিট্টু আপনাকে মনের কথা নিশ্চয়ই কিছু বলেছে। প্লিজ, যদি কিছু বলেন, খুব ভালো হয়। পুলিশ খোঁজ খবর নিচ্ছে। তাও যদি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন পাওয়া যায়”
“বুঝেছি বাবা। হ্যাঁ, বিট্টু, ওর নতুন মা রত্নাকে একদম পছন্দ করত না। রত্না, বিট্টুর সাথে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেছে। তাকে ভালো করে খেতে দিত না। তোমার উপস্থিতিতে রত্না, বিট্টুর সাথে ভালো হওয়ার ভান করত। একটা কথাই বলব, আমার কথা শুনে তুমি রত্নার সাথে কোনও ঝগড়া, বাক-বিতণ্ডায় জড়াবে না। এই সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখাটা জরুরী। বিট্টুকে নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসাটাই একমাত্র কাম্য”
“হ্যাঁ, বুঝতে পারেছি। আপনি যা বলছেন আমি অবশ্যই তা মেনে চলব। এবার আমাকে সতর্ক থাকতে হবে”
“আমার তন্দ্রার মা’র সাথে রত্নার কোনও তুলনাই হবে না। তোমার বাবার মুখে শুধু তন্দ্রামার কথা শুনতাম। সে তোমাদের সংসারটা আগলে রেখেছিল। কোথা থেকে কি হয়ে গেল? তবে আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে, তন্দ্রা ও তোমার বাবা-মায়ের দুর্ঘটনা নিছকই দুর্ঘটনা নয়। আমি নিশ্চিত নই যদিও। তবে এটা সুপরিকল্পিত একটি হত্যা। আবারও বলছি, এসব নিয়ে এখন চুপ থাকাই শ্রেয়। সতর্ক থেকো ভাইপো। বিট্টুর ফেরার অপেক্ষায় থাকো”
হরিকাকুর সাথে কথা বলে কমল বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। ওর মনের মধ্যে একরাশ শূন্যতা তৈরী হয়েছে। তবে কি রত্না? রত্নার প্রতি সবাই অভিযোগ করছে। বাড়িতে পুরনো কাজের লোকেরা কেউ নেই। যারা এসেছে তারা সবাইকে রত্না নিয়োগ করেছে। কমল শুধু নিজের কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থেকেছে। এতকিছু ব্যাপার কোনওভাবেই তাকে মাথা ঘামাতে হয়নি। মাঝখান থেকে বিট্টু নিখোঁজ হয়ে গেল। যাই হোক, কিডন্যাপারের পরের ফোন আসার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
এদিকে রত্না, মনের মধ্যে জিলিপির প্যাঁচ ছকছে। সে ভাবছে, কমলের সাথে হরিবুড়োর কি এত কথা থাকতে পারে? যা আমার সামনে বলা যাবে না। তবে যে রাজত্বর জন্য রত্না এত মাথা ঘামিয়েছে বা কাণ্ড-কারখানা করে চলেছে, শেষ পর্যন্ত কি তার সুরাহা হবে? নাকি রাজত্ব হাতছাড়া হয়ে যাবে। রত্না মনে মনে বলল, কিছুতেই তা হতে দেবে না। সে আরও জেদী হয়ে গেল। কমল আসতেই সে চিৎকার করতে শুরু করল,
“কি ভেবেছ তুমি? আমি কিছু বুঝিনা? পরের লোকের সাথে এত কি পারসোনাল কথা থাকতে পারে যে নিজের বৌ-এর সামনে বলা যায় না”
“তুমি ভুল করছ? হরিকাকা আমার আপনজন। আমার বাবার অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধু। সে দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পরিবারের সাথে জড়িয়ে আছে। তন্দ্রার সাথে আমার বিয়ের পর তিনি এসেছিলেন। তন্দ্রাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছেন। এমনকি আমাদের বিয়েতেও তিনি এসেছিলেন। ওনার সম্বন্ধে না জেনে এইভাবে কথা বলো না”
“তা হরিবুড়োর সাথে কি কথা হলো শুনি”
“ভদ্রভাবে কথা বলো। একজন সম্মানীয় ব্যক্তির সম্বন্ধে এমনভাবে কথা বলতে হয়? তোমার মা-বাবা কি এই শিক্ষা দিয়েছেন?”
রত্না এবার প্রচণ্ড চিৎকার করতে শুরু করল।
“আমার মা-বাবা কোথা থেকে এল? আমার শিক্ষা সম্বন্ধে কি জানো তুমি? একজন বাইরের লোকের জন্য আমার মা-বাবাকে ধরে টানলে? আমি আজই বাড়ি চলে যাব”
কমল বুদ্ধি করে বলল,
“আমি অন্যায় কিছুই বলিনি। বেকার চেল্লামেল্লি করছ। এখন বিট্টু নেই, ওর জন্য চিন্তায় আছি। কি শুরু করলে? তোমার যদি বাড়ি যাবার ইচ্ছা হয়, অনায়াসে যেতে পারো। আমার আপত্তি নেই”
“হ্যাঁ, আমি বাড়ি গেলেই তোমার ভালো হয়। বিট্টু যেন আমার ছেলে নয়”
রত্না নিজেকে সামলে নিয়ে ন্যাকাকান্না আরম্ভ করে দিল। রত্নার কান্নায় কমলের মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে বলল,
“তুমি তোমার বাড়ি ঘুরে এস। আমি বিট্টুকে ঠিক খুঁজে নেব। রাতদুপুরে এইভাবে কেঁদোনা, প্লিজ। কাজের লোকেরা কি ভাববে?”
রত্না কমলের কথায় কান্না থামিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে উদ্যত হতেই কমল বলল,
“কি হল? এইতো বললে নিজের বাড়ি চলে যাবে”
রত্না আর একটাও কথা না বলে সেখান থেকে চলে গেল। সে বুঝে গেছে বিট্টু চলে যাওয়াতে কমল বেশ সতর্ক হয়ে গেছে। কমলকে এখন নিজের মত করে পাবে না। কিন্তু এই সম্পত্তি তার চাই। কাজেই চুপচাপ থাকাই শ্রেয়।
ওসি বিশ্বজিৎ গাঙ্গুলি কমলকে ফোন করে জানতে চাইলেন,
“কিছুক্ষণ আগে ল্যান্ডফোনে আর একটি কল এসেছিল। কিডন্যাপাররা কি কল করেছিল? এবারের কলটাও বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়নি, আমরা নাম্বারটা ট্রেস করতে পারিনি”
“আমার পরিচিত একজন কাকু কল করেছিলেন”
“ঠিক আছে। সাবধানে থাকবেন। আমরা বিট্টুর কোনও খবর পেলেই আপনাকে জানাব”
কমলের খুব হতাশ লাগছে। কোথায় তার সন্তান বিট্টু? বিট্টুর ছবির দিকে তাকিয়ে সে ফিরে গেল পুরনো স্মৃতিতে…
-------------------
বিট্টুর কোনও খবর কি কমল পাবে? পড়ুন পরের ২১তম পর্বে…
0 Comments.